
বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার নদীবেষ্টিত জনপদে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে নৌকা তৈরির শিল্পে। বিভিন্ন বাজার, নদীতীর ও সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী নৌকার হাট। সকাল থেকে সন্ধ্যা, কোথাও কোথাও রাত পর্যন্ত কাঠ কাটা, নৌকা তৈরি, মেরামত ও বিক্রির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা।
পদ্মা, মেঘনা, ধনাগোদা ও ডাকাতিয়া নদীঘেরা এই উপজেলার কাশিমপুর মুন্সীরহাট, নায়েরগাঁও, নারায়ণপুর, ধনারপাড়, নাগদা, বরদিয়া বাজার, মোবারকদী, ডাকঘর ও বাইশপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন নৌকা তৈরির মৌসুম চলছে পুরোদমে। কোথাও কাঠ চেরাই, কোথাও তক্তা বসানো, আবার কোথাও হাতুড়ি-পেরেকের শব্দে মুখর পুরো এলাকা।
স্থানীয়দের মতে, বর্ষায় চরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন, মাছ ধরা এবং গবাদিপশুর জন্য ঘাস সংগ্রহের অন্যতম ভরসা নৌকা। তাই বর্ষা শুরুর আগেই শুরু হয় নতুন নৌকা তৈরির প্রস্তুতি।
মোবারকদী এলাকার নৌকা ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, “বর্ষা ঘনিয়ে এলেই আমাদের কাজ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এখন প্রতিদিনই নতুন অর্ডার পাচ্ছি। ছোট ডিঙি নৌকার পাশাপাশি মাঝারি আকারের নৌকার চাহিদাও ভালো। কাঠের দাম বাড়লেও প্রয়োজনের কারণে মানুষ নৌকা কিনছেন।”
তিনি আরও বলেন, “চাঁদপুরের পাশাপাশি লক্ষ্মীপুর, শরীয়তপুর ও কুমিল্লা থেকেও অনেক ক্রেতা আসছেন। সময়মতো নৌকা বুঝিয়ে দিতে অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়েও কাজ করতে হচ্ছে।”
নৌকা নির্মাণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, “একটি ছোট নৌকা বানাতে প্রায় দুই দিন সময় লাগে। কাঠ, পেরেক ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়েছে, তবুও আমরা মান বজায় রেখে কাজ করার চেষ্টা করি। বর্ষা মৌসুমই আমাদের আয়ের প্রধান সময়।”
স্থানীয় ক্রেতা শরিফুল ইসলাম বলেন, “ছোট নৌকা ৬ থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। আর বড় নৌকার দাম এক লাখ টাকারও বেশি। প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষ নৌকা কিনছেন, কারণ চরাঞ্চলে এটি এখনও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন।”
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১২ থেকে ১৪ হাতের ছোট নৌকা সাধারণত ব্যক্তিগত যাতায়াত ও মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে ৩০ থেকে ৪০ হাতের বড় নৌকা কৃষিপণ্য পরিবহন, মালামাল বহন এবং যাত্রী পারাপারে ব্যবহার করা হয়।
কারিগর মো. রফিকুল মিয়া বলেন, “আমরা চাই এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প টিকে থাকুক। যদি সহজ শর্তে ঋণ বা সরকারি সহায়তা পাওয়া যায়, তাহলে আরও উন্নত মানের নৌকা তৈরি করা সম্ভব হবে এবং অনেক নতুন মানুষের কর্মসংস্থানও হবে।”
স্থানীয়দের মতে, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলেও নদী ও চরাঞ্চলনির্ভর জনপদে নৌকার গুরুত্ব এখনো অপরিসীম। তাই প্রতি বর্ষায় মতলব দক্ষিণের নৌকা শিল্প শুধু স্থানীয় অর্থনীতিকেই সচল রাখে না, শতাধিক কারিগর ও শ্রমিকের জীবিকাও নিশ্চিত করে।








