বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রগতির মূল্য কত: এআইয়ের আড়ালে নিঃশেষ হচ্ছে বিশুদ্ধ পানি?

ওসমান গনি

Rising Cumilla -What is the Price of Progress- Is Pure Water Being Depleted Behind the Rise of AI
প্রগতির মূল্য কত: এআইয়ের আড়ালে নিঃশেষ হচ্ছে বিশুদ্ধ পানি?/ছবি: এআই/রাইজিং কুমিল্লা সম্পাদিত

স্মার্টফোনের স্ক্রিনে কয়েকটা শব্দ লিখে পাঠালেই চোখের পলকে ফুটে উঠছে কাঙ্ক্ষিত উত্তর, তৈরি হয়ে যাচ্ছে সুন্দর একটি ছবি কিংবা জটিল কোনো গবেষণার সারসংক্ষেপ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আজ আমাদের জীবনকে এতটাই সহজ ও চটপটে করে তুলেছে যে, এটিকে আমরা কেবলই এক অলৌকিক ডিজিটাল প্রযুক্তি বলে মনে করি। কিন্তু স্ক্রিনের ওপারে চোখের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কঠিন ও বস্তুগত বাস্তব।

এআই কোনো শূন্যতার মধ্য থেকে কাজ করে না; একে সচল রাখতে বিশ্বজুড়ে দিনরাত জ্বলছে লাখ লাখ প্রসেসর। আর চরম উত্তাপে জ্বলতে থাকা এসব বিশাল ডাটা সেন্টার ঠান্ডা রাখতে নীরবে বাষ্পীভূত হয়ে যাচ্ছে ট্রিলিয়ন লিটার সুপেয় পানি। আমরা যখন এআইয়ের জাদুকরী সুফলে মুগ্ধ, তখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে কিন্তু মানুষের সুপেয় পানির পাত্রটি আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে আসছে।

প্রগতির এই আলো কি তবে আমাদের অস্তিত্বের সবচেয়ে মৌলিক উপাদান বিশুদ্ধ পানিকেই নিঃশেষ করে দিচ্ছে? এআইয়ের এই অদৃশ্য পানির তৃষ্ণা এবং মানবজীবনে তার মারাত্মক প্রভাব নিয়ে ভাবার সময় এখনই।

একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। যেকোনো প্রশ্নের উত্তর খোঁজা, কঠিন গাণিতিক বিশ্লেষণ, পেশাদারি লেখালেখি, ছবি ও ভিডিও তৈরি কিংবা জটিল গবেষণার কাজ—সবই এখন হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনের মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডেই করা সম্ভব হচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ, গতিশীল ও সমৃদ্ধ করেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই অভাবনীয় ডিজিটাল বিপ্লবের পেছনে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য ও গভীর সংকট। আমরা যখন চ্যাটবটের সঙ্গে কথাপোকথন কিংবা কোনো এআই টুল ব্যবহার করি, তখন নেপথ্যে সার্ভার রুমগুলোতে নীরবে বাষ্পীভূত হয়ে শেষ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ, সুপেয় ও বিশুদ্ধ পানি।

বাহ্যিকভাবে এআই-কে সম্পূর্ণ কাল্পনিক বা ভার্চুয়াল জগত মনে হলেও বাস্তবে এর একটি বিশাল ভৌগোলিক ও বস্তুগত অস্তিত্ব রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গড়ে তোলা হয়েছে সুবিশাল ডাটা সেন্টার। এসব ডাটা সেন্টারে হাজার হাজার শক্তিশালী কম্পিউটার প্রসেসর এবং গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (GPU) দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে। আমরা যখন এআই-কে কোনো নির্দেশ দিই, তখন এই শক্তিশালী প্রসেসরগুলো দ্রুত গতিতে কোটি কোটি হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে। এই প্রক্রিয়ায় চিপগুলো মারাত্মক গরম হয়ে ওঠে। যদি প্রসেসরগুলোকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ঠান্ডা রাখা না হয়, তবে পুরো ডাটা সেন্টারের যন্ত্রাংশ পুড়ে অকেজো হয়ে যাবে।

এই চরম উত্তাপ থেকে সার্ভারগুলোকে রক্ষা করার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায় হলো পানির ব্যবহার। বিশেষ কুলিং টাওয়ারের মাধ্যমে পাইপলাইনে বরফশীতল পানি প্রবাহিত করা হয় এবং প্রসেসরের ওপর ঠান্ডা পানির সূক্ষ্ম স্প্রে করা হয়। ডাটা সেন্টারের তীব্র উত্তাপে সেই পানির বড় একটি অংশ বাষ্প হয়ে আকাশে উড়ে যায়, যা আর সরাসরি খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। এ ছাড়া ডাটা সেন্টারগুলো পরিচালনার জন্য যে বিশাল পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনেও (যেমন: কয়লা, গ্যাস বা হাইড্রো ইলেকট্রিক পাওয়ার প্ল্যান্টে) পরোক্ষভাবে বিপুল পরিমাণ সুপেয় পানি খরচ হয়।

সহজ হিসাব করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ একটি ছোট বার্তা বা প্রম্পট প্রসেস করতে এআই ডাটা সেন্টারে কয়েক মিলিলিটার পানি লাগে। কিন্তু যখন এআই দিয়ে কোনো উচ্চমানের ছবি জেনারেট বা এডিট করা হয় কিংবা কোনো দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রসেস করা হয়, তখন এক একটি কাজের পেছনে প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ মিলিলিটার—অর্থাৎ প্রায় আধা লিটার থেকে এক বোতল বিশুদ্ধ পানি খরচ কিংবা বাষ্পীভূত হয়। শুনতে হয়তো এক বোতল পানি খুব বেশি মনে নাও হতে পারে, কিন্তু প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ যখন হাজার হাজার কোটি প্রম্পট ও ছবি জেনারেট করছে, তখন দৈনিক পানি খরচের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে শতকোটি লিটারে।

এই অনিয়ন্ত্রিত পানি ব্যবহারের সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের বাস্তব জীবনে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে আগে থেকেই পানির সংকট রয়েছে বা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে, সেখানে এআই ডাটা সেন্টার নির্মাণ স্থানীয় মানুষের সুপেয় পানি ও কৃষিকাজের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাটা সেন্টারগুলো আশপাশের নদী, হ্রদ কিংবা ভূগর্ভস্থ অ্যাকুইফার (Aquifer) থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ গ্যালন সুপেয় পানি তুলে নিচ্ছে। ফলে স্থানীয় অধিবাসীরা খাবার পানি ও টিউবওয়েলে পানি না পাওয়ার সংকটে পড়ছেন, কৃষকদের সেচের পানি শুকিয়ে যাচ্ছে এবং কৃষিপণ্য উৎপাদনে মন্দা দেখা দিচ্ছে।

ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এ নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে অ্যারিজোনা ও ওরেগনের মতো খরাপ্রবণ এলাকায় বিশাল ডাটা সেন্টারগুলোর পানি ব্যবহারের বিরুদ্ধে পরিবেশবিদ ও স্থানীয় অধিবাসীরা রাস্তায় নেমেছেন। ইউরোপের দেশ স্পেনে কয়েক বছরের ভয়াবহ খরার পর কৃষকরা তাদের সেচের পানি রক্ষার দাবিতে টেক কোম্পানিগুলোর ডাটা সেন্টার প্রকল্পের তীব্র বিরোধিতা করছেন। উরুগুয়েতে সাম্প্রতিক সময়ে ইতিহাসখ্যাত সুপেয় পানির সংকট চলাকালে এক টেক জায়ান্ট বিশাল ডাটা সেন্টার করার পরিকল্পনা করলে জনরোষের মুখে তারা পানির বদলে বাতাস দিয়ে ঠান্ডা করার প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলিতে আদালতের রায়ে পানির সুরক্ষার স্বার্থে একটি বড় ডাটা সেন্টারের অনুমোদন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এসব ঘটনা স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিগত তৃষ্ণা এখন মানুষের মৌলিক জীবনধারনের সরাসরি মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।

তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, পানির সংকটের কথা চিন্তা করে কি মানুষের এআই বা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া উচিত? উত্তর হলো, একদমই নয়। প্রযুক্তি বর্জন করা কোনো সমাধান হতে পারে না; সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, সমস্যা সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অভাবে। পৃথিবীতে মানুষের ব্যবহারের জন্য যে সুপেয় পানি রয়েছে, তার সিংহভাগ (প্রায় ৭০ শতাংশ) ব্যবহৃত হয় কৃষিকাজে এবং ২০ শতাংশের বেশি ব্যবহৃত হয় সাধারণ শিল্পকারখানায়। এআই ডাটা সেন্টারের ব্যবহৃত পানি সেই তুলনায় শতাংশের হিসাবে কম হলেও, এটি যেখানে অবস্থিত সেখানকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে।

তাই এই সংকট সামলাতে প্রধান দায়িত্ব নিতে হবে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ব নেতাদের। কেবল খাওয়ার উপযোগী বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার না করে ডাটা সেন্টারগুলোতে ড্রেনেজ বা কারখানার শোধিত বর্জ্য পানি (Recycled Water) এবং সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করে ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি প্রসেসর ঠান্ডা রাখার জন্য বাতাসভিত্তিক এয়ার-কুলিং (Air Cooling) কিংবা ‘ক্লোজড-লুপ ওয়াটার সিস্টেম’ প্রযুক্তি দ্রুত চালু করতে হবে, যেখানে একই পানি বারবার রিসাইকেল করে ব্যবহার করা যায় এবং বাষ্পীভবন শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। টেক জায়ান্টদের ২০৩০ সালের মধ্যে ‘ওয়াটার পজিটিভ’ বা ব্যবহৃত পানির চেয়ে বেশি পানি প্রাকৃতিক উৎস ও জলাশয়ে ফিরিয়ে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা কঠোরভাবে আইনি তদারকির অধীনে আনতে হবে।

একই সাথে সাধারণ ব্যবহারকারী হিসেবে আমাদেরও কিছুটা দায়িত্বশীল হতে হবে। অনর্থক প্রম্পট দেওয়া, অপ্রয়োজনে বারবার ছবি জেনারেট বা পরিবর্তন করার অভ্যাস এড়িয়ে চলে কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট কাজের জন্য এআই ব্যবহার করা উচিত। ডিজিটাল প্রযুক্তিরও যে একটি পরিবেশগত ও প্রাকৃতিক মূল্য রয়েছে, তা অনুধাবন করাই হলো সচেতন নাগরিকের লক্ষণ।

প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে মানবজাতির অগ্রগতি, কল্যাণ ও সুবিধা বাড়াতে। কিন্তু সেই প্রগতির চাকা চালাতে গিয়ে যদি আমরা মানুষের বেঁচে থাকার মূল উপাদান—বিশুদ্ধ পানিকেই নিঃশেষ করে দিই, তবে সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তীব্র তৃষ্ণা ও পানিশূন্যতার হাত থেকে বাঁচাতে প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে একটি সুষম ভারসাম্য রক্ষা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো স্বাধীন সত্তা নয়, বরং এটি মানুষেরই তৈরি একটি যুগান্তকারী হাতিয়ার। প্রগতির আলো ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি এই প্রযুক্তি যে নিঃশব্দে সুপেয় পানির মতো অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ গ্রাস করছে, তা আজকের বাস্তবতায় অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সংকট প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যে নয়, সংকট লুকিয়ে আছে সম্পদ ব্যবস্থাপনার দূরদর্শিতা ও জবাবদিহিতার অভাবে। এক গ্লাস খাবার পানি কিংবা এক একর জমির সেচের পানির বিপরীতে হাজার হাজার লিটার বিশুদ্ধ পানির বাষ্পীভবন কখনোই কোনো স্থায়ী উন্নয়নের লক্ষণ হতে পারে না।

প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকে অবিলম্বে পরিবেশবান্ধব ও পানি-সাশ্রয়ী কুলিং প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে এবং খরাপ্রবণ এলাকায় পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণ, করপোরেট পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং সাধারণ ব্যবহারকারীর ডিজিটাল সচেতনতা, এই তিনের মেলবন্ধনেই সমাধান সম্ভব। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, প্রযুক্তির গতি যতই বৃদ্ধি পাক, সুপেয় পানির কোনো বিকল্প বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে নেই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই ও নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে এআই প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির প্রতিটি ফোটা রক্ষা করার এখনই সর্বোচ্চ সময়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন