শুক্রবার ১৯ জুন, ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী বাঙালি মুসলিমদের জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে ভারত: অভিযোগ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের

রাইজিং কুমিল্লা ডেস্ক

RisingCumilla - India is forcibly pushing Bengali Muslims living in West Bengal to Bangladesh- Human Rights Watch alleges
পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী বাঙালি মুসলিমদের জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে ভারত: অভিযোগ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের/ছবি: আল–জাজিরা থেকে স্ক্রিটশট

পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী বাঙালিদের, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যদের, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বাংলাদেশে জোরপূর্বক পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি দাবি করেছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সীমান্তবর্তী এলাকার বহু মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া তাদের প্রবেশে বাধা দেওয়ায় অনেক পরিবার দুই দেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী ‘জিরো লাইনে’ আটকা পড়ে মানবিক সংকটে পড়ছে।

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে এ পর্যন্ত বিএসএফের অন্তত ২১টি ‘পুশইন’ প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় শিশুসহ ২০০ জনের বেশি মানুষকে বাংলাদেশে প্রবেশ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসনের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় শত শত সন্দেহভাজন বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, ইতোমধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে নির্মমভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রাখছে, যা তাদের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। অবৈধ বহিষ্কার বন্ধ করে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সমন্বয় করা উচিত।”

সংস্থাটি জানায়, তারা এমন নয়জন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে যারা দেখেছেন, রাতের আঁধারে বিএসএফ বিভিন্ন দলকে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কয়েকটি ঘটনায় বিজিবি বাধা দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরে আবার ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পঞ্চগড় সীমান্তে ৫ জুন শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হলে প্রায় ৭৫ ঘণ্টার অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রবল বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও এসব মানুষকে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করতে হয়েছে।

এছাড়া ঠাকুরগাঁও সীমান্তে দুটি মুসলিম পরিবারের ছয় সদস্য এবং পৃথক আরেক ঘটনায় এক গর্ভবতী নারীসহ ১১ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবির বাধার মুখে পরে তাদের ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেওয়া হয় বলে জানানো হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও দাবি করেছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় পশ্চিমবঙ্গে ৯০ লাখের বেশি নাম বাদ পড়ায় অনেকের মধ্যে আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংস্থাটির মতে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার কারণে অনেক মানুষ গ্রেফতার ও আটক হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে, প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া ও নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া সীমান্তে ঠেলে দেওয়া কাউকে গ্রহণ করা হবে না। সরকার বলেছে, যেকোনো প্রত্যাবাসন অবশ্যই দুই দেশের স্বীকৃত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সম্পন্ন করতে হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসা সুবিধা ছাড়া সীমান্তে মানুষকে আটকে রাখা নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণের শামিল হতে পারে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “কোনো মানুষের নাগরিকত্ব যাই হোক না কেন, তাকে দুই দেশের সশস্ত্র সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কখনোই মানুষের মৌলিক মর্যাদার বিনিময়ে পরিচালিত হতে পারে না।”

আরও পড়ুন