
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট ঘোষণা করেন তিনি।
প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ওপর শুল্ক ও কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর বাড়ানোরও প্রস্তাব এসেছে। ফলে বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমতে পারে, আবার কিছু পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে
সিগারেট ও তামাকজাত পণ্য
প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেটের ন্যূনতম খুচরা মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী—
- নিম্নস্তর: প্রতি ১০ শলাকা ৬২ টাকা
- মধ্যম স্তর: ৯২ টাকা
- উচ্চ স্তর: ১৬০ টাকা
- অতি উচ্চ স্তর: ২১০ টাকা
এ কারণে সিগারেটের দাম বাড়বে।
এ ছাড়া নিকোটিন গ্র্যানুলস ও নিকোটিন পাউচকে জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর উল্লেখ করে এর ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তেলচালিত গাড়ি
পরিবেশদূষণ কমাতে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলচালিত গাড়ির ওপর করভার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ সিসি ইঞ্জিনক্ষমতার আমদানিকৃত ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিন (আইসিই) গাড়ির করভার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১৫৬ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে এসব গাড়ির দাম বাড়তে পারে।
বিদেশি কাজুবাদাম
দেশীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে অপ্রক্রিয়াজাত ও প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক যথাক্রমে ১ ও ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। যদিও দেশীয় উৎপাদকদের জন্য অপ্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের শুল্ক ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে আমদানিকৃত কাজুবাদামের দাম বাড়তে পারে।
বিদেশি পাঙাশ মাছের ফিলে
দেশীয় মৎস্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পকে সুরক্ষা দিতে আমদানিকৃত পাঙাশ মাছের ফিলের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এতে এর দাম বাড়তে পারে।
বিদেশি গ্যাস সিলিন্ডার
কম্পোজিট এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সিলিন্ডার আমদানিতে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। ফলে এর বাজারমূল্য বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিদেশি মধু
প্রাকৃতিক মধু আমদানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম শুল্কায়ন মূল্য ইউনিটপ্রতি ২ ডলার বাড়িয়ে ৭ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে আমদানিকারকদের শুল্ক ব্যয় বাড়বে এবং দামও বাড়তে পারে।
বিদেশি সুপারি
সুপারি আমদানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম শুল্কায়ন মূল্য ইউনিটপ্রতি ০.২৫ ডলার বাড়ানো হয়েছে। এতে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।
বিদেশি খাদ্যপণ্য
সুগার কনফেকশনারি, কফি, প্রস্তুত খাবারসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের শুল্কায়ন মূল্য বাড়ানো হয়েছে। ফলে এসব আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে।
বিদেশি প্রসাধনী
লিপ লাইনার, লিপ জেল এবং সমজাতীয় পণ্যের শুল্কায়ন মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে এসব পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রড
রড উৎপাদনের বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। ফলে নির্মাণসামগ্রী হিসেবে রডের দাম বাড়তে পারে।
অন্যান্য পণ্য
শুল্ক ও শুল্কায়ন মূল্য বৃদ্ধির কারণে আরও যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে—
- বিদেশি টাইলস
- স্যানিটারিওয়্যার ও বেসিন
- বিদেশি ফোম
- বিদেশি মাইক্রোওয়েভ ওভেন
- সাইকেল ও সাইকেলের যন্ত্রাংশ
- খেলনা
যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে
নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য
প্রস্তাবিত বাজেটে ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ও বীজসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
শিশুখাদ্য
শিশুখাদ্য তৈরির কাঁচামাল আমদানির শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর মতে, এর ফলে বাজারে শিশুখাদ্যের দাম কমবে।
মসলা
জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, ধনিয়াসহ বিভিন্ন মসলার ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে।
খেজুর
খেজুর আমদানির ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে বাজারে খেজুরের দাম কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সোনার গয়না
সোনা সরবরাহে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করা হয়েছে। আগে আড়াই লাখ টাকার সোনার ওপর প্রায় সাড়ে ১২ হাজার টাকা ভ্যাট দিতে হতো, যা এখন কমে প্রায় আড়াই হাজার টাকায় নেমে আসবে। ফলে সোনার গয়নার দাম কমতে পারে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি)
বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য উল্লেখযোগ্য করছাড় দেওয়া হয়েছে। ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইভির করভার ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইভির করভার ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া—
- প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়িতে করছাড় দেওয়া হয়েছে।
- বিআরটিএ নিবন্ধন ও নবায়নে অগ্রিম আয়কর কমানো হয়েছে।
- চার্জিং স্টেশন স্থাপনে ব্যাটারি ও সরঞ্জাম আমদানিতে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে।
ফলে দেশে ইভির দাম কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ল্যাপটপ ও কম্পিউটার
ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, কম্পিউটার প্রিন্টার ও মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে এসব প্রযুক্তিপণ্যের দাম কমতে পারে।
কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা
ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, এতে একজন রোগীর প্রতি ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ কমতে পারে।
ওষুধ
ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বিভিন্ন ধরনের কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্যানসারের ওষুধ তৈরির নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। এতে কিছু ওষুধের দাম কমতে পারে।
বাদ্যযন্ত্র
গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিনসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র এবং এসবের যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা
সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা এবং ক্যামেরা ও প্রজেক্টরের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
অন্যান্য পণ্য
শুল্ক ও কর কমানোর ফলে আরও যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে—
- বিদেশি মাংস
- প্রাণিখাদ্য
- পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) যন্ত্র
- সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম
- লিপস্টিক
- ফেসওয়াশ
- বিভিন্ন প্রসাধনী পণ্য
প্রস্তাবিত বাজেটে একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, শিশুখাদ্য, ল্যাপটপ, ওষুধ, সোনার গয়না ও বৈদ্যুতিক গাড়িতে স্বস্তি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সিগারেট, তেলচালিত গাড়ি, বিদেশি খাদ্যপণ্য, কাজুবাদাম, মধু, সুপারি ও বিভিন্ন আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর কর ও শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। ফলে নতুন অর্থবছরে বাজারে এসব পণ্যের দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।









