শনিবার ৭ নভেম্বর, ২০২৬

কুমিল্লায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি সংরক্ষণের দাবিতে সাইনবোর্ড ভাঙল এনসিপির নেতাকর্মীরা

রাইজিং কুমিল্লা ডেস্ক

RisingCumilla - NCP activists tore down a signboard in Comilla while demanding the preservation of Dhirendranath Dattas house.
কুমিল্লা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি সংরক্ষণের দাবিতে সাইনবোর্ড ভাঙল এনসিপির নেতাকর্মীরা/ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লার ভাষাসৈনিক ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঐতিহাসিক বাসভবন সংরক্ষণ করে সেখানে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ দাবিতে বাড়িটির সামনে জমির মালিকানা দাবি করে স্থাপন করা সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেছেন দলটির কুমিল্লা মহানগর শাখার নেতাকর্মীরা।

এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আরমা দত্ত।

শুক্রবার (৭ নভেম্বর) রাতে নগরীর ধর্মসাগরপাড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সাইনবোর্ড ভাঙার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করে সেখানে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এরই মধ্যে সম্প্রতি বাড়িটির সামনে জমির মালিকানা দাবি করে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করেন তাঁর নাতনি আরমা দত্ত।

সাইনবোর্ডে আরমা দত্ত নিজেকে ওয়ারিশ সূত্রে ওই জমির প্রকৃত মালিক দাবি করে লেখেন, ‘এই জমির প্রকৃত মালিক ওয়ারিশ সূত্রে আরমা দত্ত। পিতা মৃত সঞ্জিব দত্ত। দাগ নং ১৮০০, মৌজা ছোটরা, কুমিল্লা।’

এনসিপির নেতাকর্মীদের দাবি, ঐতিহাসিক বাড়িটি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং এর পুরোনো স্থাপনাও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাঁদের মতে, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত এই বাড়ি কোনোভাবেই হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। এটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। বাড়িটি বিক্রির উদ্যোগ ঠেকাতেই সাইনবোর্ডটি অপসারণ করা হয়েছে বলে জানান তাঁরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর এনসিপির নেতাকর্মীরা বাড়িটির সামনে সমবেত হন। সেখানে তাঁরা বাড়িটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে বক্তব্য দেন। একপর্যায়ে জমির মালিকানা দাবিতে স্থাপন করা সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলেন তাঁরা।

ঘটনার পর শুক্রবার রাতে এনসিপির কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্যসচিব মাসুমুল বারী কাওসারের স্বাক্ষরিত একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি সাধারণ কোনো স্থাপনা নয়। এটি ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। ফলে বাড়িটি ব্যক্তিগত কেনাবেচার বিষয় হতে পারে না। এটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংরক্ষণের দাবিতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করার কথাও জানায় দলটি।

রাত ১০টার দিকে মাসুমুল বারী কাওসার বলেন, ‘আমরা একটি ঐতিহাসিক বাড়ি রক্ষা করতে সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেছি। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। এ কাজে আশা করি সরকার ও ওয়ারিশ হিসেবে আরমা দত্তকে পাশে পাব। এ জায়গা বিক্রি কিংবা বহুতল ভবন করতে চাইলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিহত করা হবে।’

অন্যদিকে সাইনবোর্ড ভাঙার ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করে আরমা দত্ত বলেন, বাড়িটি তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি এবং তিনি এর বৈধ ওয়ারিশ। বিষয়টি কুমিল্লার মানুষও জানেন। বাড়ির জায়গা তিনি কী করবেন, সংরক্ষণ করবেন নাকি বিক্রি করবেন, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু রাতে এভাবে বাড়ির বৈধ সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা দুঃখজনক। এ বিষয়ে তিনি প্রশাসনকে অবহিত করবেন বলেও জানান।

এ বিষয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, সাইনবোর্ড ভাঙার বিষয়ে তাঁকে এখনো কেউ অবহিত করেননি। এ ঘটনায় অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর এই ভূমিকা বাঙালির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লার নিজ বাসভবন থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে ও তাঁর ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাঁদের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তাঁর নাতনি আরমা দত্ত একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আরও পড়ুন