
একটি সাধারণ নির্দেশনা দিয়েই শুরু হয়েছিল সবকিছু—‘আজ বাসা থেকে কাজ করুন।’ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কর্মীদের অফিসে না আসতে বলা হয়। ছিল না কোনো জরুরি বৈঠক, অফিসজুড়ে গুঞ্জন কিংবা প্রকাশ্য উদ্বেগের দৃশ্য। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই একের পর এক ই-মেইল পৌঁছাতে শুরু করে কর্মীদের ইনবক্সে। এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্ট মেটা প্ল্যাটফর্মস প্রায় ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই কার্যক্রম শুরু করেছে, যা কোম্পানিটির মোট কর্মশক্তির প্রায় ১০ শতাংশ। প্রথম ছাঁটাই বার্তা পাঠানো হয় সিঙ্গাপুর হাব থেকে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিঙ্গাপুরে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীরা স্থানীয় সময় ভোর ৪টার দিকে ই-মেইল পান। পরে বিভিন্ন টাইম জোন অনুযায়ী ধাপে ধাপে নোটিশ পাঠানো হয় অন্যান্য অঞ্চলেও।
কর্মীদের কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল ঘটনাক্রম—প্রথমে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’, এরপর ছাঁটাইয়ের নোটিশ।
এআই পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ছাঁটাই
ছাঁটাই কার্যক্রমের আগে মেটায় কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৮ হাজার। এখন হাজারো কর্মী চাকরি হারাচ্ছেন, আবার অনেককে নতুন বিভাগে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
কোম্পানির চিফ পিপল অফিসার জ্যানেল গেইল এক অভ্যন্তরীণ মেমোতে জানিয়েছেন, প্রায় ৭ হাজার কর্মীকে নতুন এআই-ভিত্তিক টিমে পুনর্বিন্যাস করা হবে। একই সঙ্গে প্রায় ৬ হাজার শূন্য পদ বাতিল করা হয়েছে এবং ব্যবস্থাপনা স্তরও কমানো হচ্ছে।
তার ভাষায়, “ছোট ছোট টিম বা গ্রুপের মাধ্যমে আরও দ্রুত ও বেশি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে পারবে বিভিন্ন বিভাগ।”
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে প্রকৌশল ও পণ্য উন্নয়ন বিভাগে। চলতি বছর আরও ছাঁটাই হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মেটার প্রধান নির্বাহী Mark Zuckerberg ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কোম্পানির প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এ বছর প্রতিষ্ঠানটি ১২৫ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে, যার বড় অংশই যাবে এআই খাতে।
কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ
গত মাসে ছাঁটাইয়ের তথ্য ফাঁস হওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার আগেই অনেক কর্মী বিনামূল্যের খাবার ও অতিরিক্ত ল্যাপটপ চার্জার সংগ্রহ করতে শুরু করেছিলেন।
একই সময়ে খবর আসে, কর্মীদের মাউসের নড়াচড়া ও কিবোর্ড ব্যবহারের তথ্য পর্যবেক্ষণে নতুন একটি অভ্যন্তরীণ টুল চালু করেছে মেটা, যা এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হবে। এ নিয়ে কর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এক হাজারের বেশি কর্মী এর বিরোধিতা করে পিটিশনে সই করেন।
অনেক কর্মীর ধারণা, বাসা থেকে কাজের নির্দেশনার মাধ্যমে ছাঁটাই প্রক্রিয়াটি ‘নীরবে’ সম্পন্ন করা হয়েছে, যাতে অফিসে কোনো বিশৃঙ্খলা বা প্রতিবাদ না হয়।
প্রযুক্তি খাতে ছাঁটাইয়ের ঢেউ
শুধু মেটাই নয়, প্রযুক্তি খাতজুড়ে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সিসকো সিস্টেমস সম্প্রতি ৪ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। এছাড়া মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, ডিজনি এবং এএসএমএল-ও কর্মী ছাঁটাই বা স্বেচ্ছা অবসরের ঘোষণা দিয়েছে।
এপ্রিল মাসে ওরাকল বিভিন্ন দেশে ভোরবেলার ই-মেইলের মাধ্যমে আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছিল।
‘এটি সাময়িক সংকট নয়’
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রিডোকিউর প্রধান নির্বাহী দীপল দত্ত মনে করেন, এটি সাময়িক অর্থনৈতিক সংকট নয়; বরং প্রযুক্তি খাতে স্থায়ী কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
তার ভাষায়, “জেনারেটিভ এআই ও স্বয়ংক্রিয় কর্মপ্রবাহ এখন নিয়মিত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, গ্রাহকসেবা ও তথ্য ব্যবস্থাপনাকে সাধারণ কাজে পরিণত করেছে। ফলে কর্মীসংখ্যা বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রচলিত প্রযুক্তি মডেল ভেঙে পড়ছে।”
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে শুধু কোড লেখা নয়; বরং জটিল এআই-ভিত্তিক সিস্টেম পরিচালনা ও নকশা তৈরির দক্ষতার চাহিদাই সবচেয়ে বেশি বাড়বে।
সূত্র: NDTV










