
জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে জমি-সম্পত্তি বিক্রি, ভুয়া উত্তরাধিকার দাবি এবং পাসপোর্টের তথ্য পরিবর্তনের মতো জালিয়াতির ঘটনা সামনে আসায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এখন থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত না হয়ে কোনো আবেদন অনুমোদন দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। জালিয়াতিতে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, এনআইডি সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগে ইতোমধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে এবং গ্রেফতারের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, পরিচয়পত্রের তথ্য পরিবর্তন করে কেউ যাতে সম্পত্তি বিক্রি কিংবা অন্যের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার দাবি করতে না পারেন, সে জন্য যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
ইসি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সংশোধনের আবেদনে নানা ধরনের অসংগতি পাওয়া যাচ্ছে। কোনো ক্ষেত্রে বাবা ও ছেলের বয়সের ব্যবধান মাত্র তিন বছর, আবার মা ও মেয়ের বয়সের ব্যবধান দুই থেকে তিন বছর দেখানো হচ্ছে। কারও কারও একাধিক জন্মনিবন্ধন ও শিক্ষাগত সনদও রয়েছে। এসব নথির মধ্যে তথ্যের অমিল থাকলে প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি ভুয়া পরিচয়ে এনআইডি সংগ্রহের আশঙ্কাও রয়েছে।
ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, অনেক আবেদনকারী আগের নিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক জন্মতারিখ সংশোধন করতে চান। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, কেউ ১৯৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করে ২০১৫ সালে ১৮ বছর বয়সে ভোটার হয়েছেন। পরে তিনি জন্মসাল ২০০২ করার আবেদন করলে ভোটার হওয়ার সময় তাঁর বয়স দাঁড়ায় ১৩ বছর। এ ধরনের অসংগতিপূর্ণ আবেদন গ্রহণ করা সম্ভব নয়। বিদেশযাত্রা বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কথা জানিয়ে মানবিক বিবেচনায় সংশোধনের আবেদন করলেও তথ্য যাচাইয়ের নিয়ম অনুসরণ করতে হয়।
নাম, বাবা-মায়ের পরিচয় ও জন্মতারিখের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংশোধনে একাধিক নথি পরীক্ষা করা হচ্ছে। পিতার নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর ভাই-বোনের এনআইডি এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। জন্মনিবন্ধন ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদও যাচাই করা হয়। শুধু হলফনামা দিয়ে এ ধরনের সংশোধন অনুমোদনের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে কমিশন। সাধারণ কিছু সংশোধন উপজেলা নির্বাচন কার্যালয় থেকে করা গেলেও জটিল আবেদন উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়।
এদিকে জালিয়াতির অভিযোগে সম্প্রতি ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আ. ছত্তার এবং পঞ্চগড় সদর কার্যালয়ের অফিস সহকারী কামনা রানী সরকারকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে ইসি। কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, সংশোধনের প্রক্রিয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা কিংবা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত জমা পড়া ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি সংশোধন আবেদনের মধ্যে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি আবেদন বাতিল করা হয়েছে। তবে বাতিল হওয়া আবেদনের সংখ্যা দিয়ে প্রকৃত আবেদনকারীর সংখ্যা নির্ধারণ করা যাবে না। কারণ, একই ব্যক্তি একাধিকবার আবেদন করতে পারেন। আবার একটি আবেদনে একাধিক তথ্য সংশোধনের অনুরোধ থাকলে কোনো একটি তথ্য সংশোধন হলেও অন্যটি বাতিল হতে পারে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে আবেদনকারীরা পুনরায় আবেদন করার সুযোগ পাবেন। উপজেলা থেকে মহাপরিচালক পর্যায়ে আবেদন বাতিল হলে সচিব পর্যায়েও আপিলের সুযোগ রয়েছে।
প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনের বিষয়েও কাজ করছে কমিশন। যেসব আবেদনকারীর কাগজপত্র ও তথ্য সঠিক, তাদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি দূতাবাসে প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি সেবা চালু হয়েছে। তবে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন ও এনআইডির তথ্যে অমিল থাকলে তা যাচাই করতে সময় লাগছে। বিশেষ করে কাজের জন্য বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে বয়সের শর্ত পূরণ করতে অনেকে জন্মতারিখ পরিবর্তনের আবেদন করেন বলে জানিয়েছেন ইসি কর্মকর্তারা।
ঠিকানা পরিবর্তন, বিয়ে বা বিবাহবিচ্ছেদের কারণে বৈবাহিক অবস্থা পরিবর্তন কিংবা ধর্ম পরিবর্তনের মতো বিষয় নির্ধারিত নিয়মে সংশোধন করা সম্ভব। তবে নাম, জন্মতারিখ ও বাবা-মায়ের পরিচয়ের মতো মৌলিক তথ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে চায় কমিশন। ইসির লক্ষ্য, ভোটার নিবন্ধনের সময়ই যেন নাগরিকেরা সঠিক তথ্য দেন। কারণ, একবার ভুল তথ্য দিয়ে পরিচয়পত্র তৈরি হলে পরবর্তী সময়ে তা সংশোধনের জটিলতা শুধু আবেদনকারীর জন্য নয়, সম্পত্তির মালিকানা ও উত্তরাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে।
সূত্র: বাসস










