
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে সামষ্টিক চাপের মুখে রয়েছে উল্লেখ করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেছেন, উচ্চ খেলাপি ঋণ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বৈদেশিক ঋণ অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতির মধ্যে সরকার কীভাবে এই বাজেট বাস্তবায়ন করবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সোমবার (১৫ জুন) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট ও সম্পূরক মঞ্জুরি দাবির ওপর দেওয়া ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
বক্তব্যের শুরুতেই বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকের তথ্য তুলে ধরেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জিডিপির আকার বর্তমানে ৬৮ লাখ কোটি টাকা। জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে, আর মূল্যস্ফীতি রয়েছে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে। দেশের মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ এখন খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।
তিনি আরও বলেন, সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে মূলধনের পর্যাপ্ততা ঋণাত্মক অবস্থায় পৌঁছেছে এবং তা বর্তমানে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমতে কমতে ২২ শতাংশ থেকে নেমে ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ২২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা রপ্তানি হ্রাস এবং আমদানি বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে।
অর্থ পাচারের প্রসঙ্গ টেনে রুমিন ফারহানা বলেন, শ্বেতপত্র অনুযায়ী গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ১৪ থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে গেছে। অন্যদিকে গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির তথ্য অনুযায়ী, ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যাদের দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা ছিল না, তাদেরও বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একের পর এক ব্যাংক নির্দিষ্ট পরিবার বা গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রুমিন ফারহানা বলেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সুদের হার ও ডলারের বিনিময় মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ডলারের ওপর চাপ কমানোর জন্য কৃত্রিমভাবে মূল্য ধরে রাখা হয়েছিল। এর ফলে ১৮ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, শেয়ারবাজার এবং কর ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত সংস্কার না হলে পুরো চাপ গিয়ে পড়বে ব্যাংক খাতের ওপর। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতি বাজেট দেওয়ার একটি সংস্কৃতি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ঘাটতি পূরণ করা হয় দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কিংবা বিদেশি ঋণ ও অনুদানের মাধ্যমে।
রুমিন ফারহানা প্রশ্ন তুলে বলেন, যেখানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ও মন্দ ঋণের পরিমাণ মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে, সেখানে ব্যাংকগুলো আদৌ ব্যক্তি খাতে নতুন বিনিয়োগের জন্য ঋণ দেওয়ার অবস্থায় আছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সম্প্রতি জানিয়েছে যে, বাংলাদেশকে দেওয়া ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি বর্তমান চুক্তির আওতায় আর দেওয়া হবে না এবং নতুন সরকারের সঙ্গে নতুন করে চুক্তি করতে হবে। ফলে সরকারকে এখন ঋণের জন্য চীনসহ অন্যান্য দেশের দিকে তাকাতে হতে পারে।
তিনি উল্লেখ্য করেন, এডিবি, বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের বাইরে গিয়ে অন্য কোনো দেশ থেকে ঋণ নেওয়া হলে সাধারণত সেখানে সুদের হার বেশি থাকে এবং তুলনামূলক দ্রুত সময়ে সেই ঋণ পরিশোধের চাপও তৈরি হয়।
এসব বাস্তবতা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে রুমিন ফারহানা প্রশ্ন রাখেন, “এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে সরকার কীভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন করবে?”








