
কল্পনা করুন এমন এক পরজীবীর কথা, যা কোনো অস্ত্রোপচার বা কাটাছেঁড়া ছাড়াই সরাসরি মানুষের ত্বক ভেদ করে শরীরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। এরপর রক্তনালিতে অবস্থান নিয়ে নিঃশব্দে বংশবিস্তার করে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন—লিভার, ফুসফুস ও যৌনাঙ্গকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই রোগের নাম স্কিস্টোসোমিয়াসিস, যা সাধারণভাবে ‘স্নেইল ফিভার’ বা ‘শামুক জ্বর’ নামে পরিচিত। বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি এখন একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ত্বকই যখন প্রবেশের পথ
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই রোগের জন্য দায়ী পরজীবীর লার্ভা মূলত মিষ্টি পানিতে বসবাসকারী বিশেষ ধরনের শামুকের শরীরে বেড়ে ওঠে। কোনো ব্যক্তি যখন ওই দূষিত পানির সংস্পর্শে আসে, তখন লার্ভাগুলো বিশেষ ধরনের এনজাইম নিঃসরণ করে মানুষের ত্বক গলিয়ে শরীরে প্রবেশ করে।
পরবর্তীতে এই লার্ভা রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে এবং পূর্ণবয়স্ক হয়ে রক্তনালির ভেতরে ডিম পাড়তে শুরু করে। এই ডিমগুলো শরীরের টিস্যুতে আটকে গিয়ে মারাত্মক সংক্রমণ সৃষ্টি করে।
বছরের পর বছর থাকে অজানা
স্নেইল ফিভারের অন্যতম ভয়ংকর দিক হলো—এটি শরীরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলেও অনেক ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ প্রকাশ পায় না। অনেক রোগী পেটে ব্যথা বা সাধারণ অসুস্থতা মনে করলেও ভেতরে ভেতরে এটি ক্যানসার বা অঙ্গ বিকল হওয়ার মতো গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ২৫ কোটি মানুষ এই রোগের চিকিৎসা নেন। আক্রান্তদের বড় অংশ আফ্রিকার বাসিন্দা হলেও বর্তমানে চীন, ভেনেজুয়েলা ও ইন্দোনেশিয়াসহ ৭৮টি দেশে এই রোগের বিস্তার দেখা গেছে।
যৌনাঙ্গে সংক্রমণ ও বন্ধ্যত্বের ঝুঁকি
সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা নতুন ধরনের ‘হাইব্রিড’ বা অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন পরজীবীর সন্ধান পেয়েছেন। এসব পরজীবী মানুষের যৌনাঙ্গে সংক্রমণ ঘটিয়ে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে, যা অনেক সময় যৌনবাহিত রোগ হিসেবে ভুলভাবে শনাক্ত হয়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, নারীদের ক্ষেত্রে এটি বন্ধ্যত্বের কারণ হতে পারে এবং পুরুষদের ক্ষেত্রেও নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
মালাউই-লিভারপুল ওয়েলকাম ক্লিনিক্যাল রিসার্চ প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক জানেলিসা মুসায়া বলেন, এই পরজীবী প্রজননতন্ত্রে এমনভাবে ক্ষত তৈরি করে যা সাধারণ পরীক্ষায় শনাক্ত করা কঠিন। ফলে অনেক নারী বন্ধ্যত্বের শিকার হন এবং এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে রোগটি সাধারণ যৌনরোগ ভেবে ভুল করা হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
জলবায়ু পরিবর্তনে আরও শক্তিশালী হচ্ছে ঘাতক
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানুষের অবাধ ভ্রমণের কারণে এই পরজীবী নতুন নতুন অঞ্চলে বিস্তার লাভ করছে। দক্ষিণ ইউরোপসহ আগে ঝুঁকিমুক্ত মনে করা অনেক এলাকাতেও এখন এই রোগের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্কিস্টোসোমিয়াসিস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রধান ডা. আমাদু গারবা জিরমে এই পরিস্থিতিকে ‘বৈশ্বিক উদ্বেগ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের চলাচলের কারণে এই পরজীবী দ্রুত নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে এবং নতুন হাইব্রিড প্রজাতিগুলোকে প্রচলিত পরীক্ষায় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে উঠছে।
প্রতি বছর ৩০ জানুয়ারি ‘ওয়ার্ল্ড নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজ ডে’ পালন করা হয়। এর লক্ষ্য হলো স্নেইল ফিভারের মতো দরিদ্র অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বেশি ছড়িয়ে থাকা অবহেলিত রোগগুলো সম্পর্কে বিশ্ববাসীর সচেতনতা বাড়ানো।
২০০৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ প্রায় ৬০ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল কমে যাওয়ায় এই অগ্রগতি হুমকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই রোগ থেকে সুরক্ষিত থাকতে হলে—
দূষিত বা সন্দেহজনক পানির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে
ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের বাসিন্দাদের নিয়মিত অ্যান্টি-প্যারাসাইটিক ওষুধ গ্রহণ করতে হবে
কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে
সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এই পরজীবী কেবল একটি সাধারণ অসুখ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রাণঘাতী সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা










