
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে ইসলামের দুই পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজিরবিহীন সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলেছে সৌদি আরব। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে দেশটি তাদের আকাশসীমাকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী মাল্টি-লেয়ারড (বহুস্তরীয়) প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে এসেছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধেয়ে আসা প্রতিকূল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা বিভাগ তাদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। এই বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।
সৌদি আরবের এই দুর্ভেদ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো মার্কিন প্রযুক্তির প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ সিস্টেম। এই ব্যবস্থা স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে মাঝ আকাশেই সেগুলোকে নির্ভুলভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম। পবিত্র মক্কা ও মদিনার প্রধান ঢাল হিসেবে এই সিস্টেমটি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এর শত শত ইন্টারসেপ্টর ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো আকস্মিক হামলার বিরুদ্ধে এটি অত্যন্ত দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
প্যাট্রিয়টের পাশাপাশি উচ্চতর নিরাপত্তার জন্য সৌদি আরব তাদের প্রতিরক্ষা ভাণ্ডারে যুক্ত করেছে টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স সিস্টেম। এটি বিশ্বের অন্যতম উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা বায়ুমণ্ডলের ভেতরে এবং বাইরে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। ২০২৫-২৬ সালের শুরুর দিকে মক্কা ও মদিনা-সহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে এই সিস্টেমের প্রথম ইউনিট সক্রিয় করা হয়েছে। ফলে অত্যন্ত উচ্চগতিসম্পন্ন এবং দূরপাল্লার মিসাইলও এখন সৌদি আরবের পবিত্র ভূমিতে পৌঁছানোর আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বৈচিত্র্য ও কার্যকারিতা বাড়াতে দেশটি দক্ষিণ কোরিয়ার তৈরি কেএম-স্যাম ব্লক টু মোবাইল সিস্টেম মোবাইল সিস্টেমও মোতায়েন করেছে। এটি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র—উভয় লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারে। মার্কিন প্রযুক্তির পাশাপাশি এই কোরিয়ান প্রযুক্তির সংযোজন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য করে তুলেছে। এই সিস্টেমের অন্যতম সুবিধা হলো এর গতিশীলতা, যা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।
ড্রোন হামলা প্রতিহত করার ক্ষেত্রেও সৌদি আরব ব্যবহার করছে আধুনিক প্রযুক্তি। এর মধ্যে রয়েছে চিনা ফাইবার-অপটিক লেজার অস্ত্র। প্রায় ৩০ কিলোওয়াট শক্তির এই লেজার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আকাশে থাকা ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম। যদিও মরুভূমির ধূলিময় পরিবেশে কখনও কখনও এর কার্যকারিতা কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তবুও ছোট ও দ্রুতগতির ড্রোন প্রতিরোধে এটি কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তুলনামূলক কম খরচে ড্রোন হামলা ঠেকানোর ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
আকাশ প্রতিরক্ষার সর্বশেষ স্তর হিসেবে মোতায়েন করা হয়েছে স্কাইগার্ড ৩৫ মিলিমিটার কামান। যদি কোনো ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র উপরের স্তরগুলোর রাডার ফাঁকি দিয়ে শহরের খুব কাছে চলে আসে, তাহলে এই রাডারচালিত যমজ কামানগুলো লক্ষ্যবস্তুতে অবিরাম গোলাবর্ষণ শুরু করে। মক্কা ও মদিনার সীমানার কাছাকাছি এসব কামান স্থাপন করা হয়েছে, যাতে কোনো অবস্থাতেই কোনো উড়ন্ত বস্তু পবিত্র সীমানায় প্রবেশ করতে না পারে। একে নিরাপত্তার ‘লাস্ট লাইন অব ডিফেন্স’ বলা হচ্ছে।
এদিকে সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আল-খারজ প্রদেশ-এর পূর্ব অংশে একটি ক্রুজ মিসাইল এবং রিয়াদ অঞ্চলে তিনটি ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র : নিউজ২৪









