রবিবার ১২ এপ্রিল, ২০২৬

ফেনীতে ভুল চিকিৎসার অভিযোগে প্রসূতির মৃত্যু, ক্লিনিক সিলগালা

রাইজিং কুমিল্লা ডেস্ক

Rising Cumilla - Pregnant woman dies in Feni due to alleged medical malpractice, clinic sealed
ফেনীতে ভুল চিকিৎসায় অভিযোগে প্রসূতির মৃত্যু, ক্লিনিক সিলগালা/ছবি: সংগৃহীত

ফেনী শহরের ‘ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিক’-এ ভুল অস্ত্রোপচারের অভিযোগে নাঈমা আক্তার লিজা (২১) নামের এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার পরপরই স্বাস্থ্য বিভাগ ক্লিনিকটি সিলগালা করেছে। এতে জন্মের মাত্র ২০ ঘণ্টার ব্যবধানে মা হারিয়েছে নবজাতক শিশুটি।

শনিবার (১১ এপ্রিল) সন্ধ্যায় সংকটাপন্ন অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। নিহত লিজা ফেনী সদর উপজেলার ফাজিলপুর ইউনিয়নের সৌদি প্রবাসী মুজিবুল হকের স্ত্রী।

নিহতের স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (১০ এপ্রিল) প্রসবব্যথা শুরু হলে প্রথমে লিজাকে লস্করহাটের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। পরে সেখানকার এক নার্সের মাধ্যমে তাকে শহরের শহিদ শহীদুল্লা কায়সার সড়কের ‘ওয়ান স্টোপস মেটারনিটি ক্লিনিক’-এ আনা হয়। সেখানে তাকে দ্রুত সিজার করানোর জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং ২২ হাজার টাকায় চুক্তি করা হয়।

রাত ১০টার দিকে ওই ক্লিনিকে ডা. নাসরিন আক্তার মুক্তা লিজার সিজার করেন। তবে অপারেশনের পরপরই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরে অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়।

স্বজনদের অভিযোগ, অপারেশনের পর থেকেই লিজার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হলেও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। একাধিকবার জানানো হলেও তা স্বাভাবিক বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। পরদিন তাকে কয়েক দফা রক্ত দেওয়া হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরে স্বজনদের চাপে তাকে ফেনীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানকার চিকিৎসক দ্রুত চট্টগ্রামে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

নিহতের স্বজন এমরান হোসেন বলেন, অপারেশনের পর থেকেই তার রক্তক্ষরণ হচ্ছিল, কিন্তু চিকিৎসকরা কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসক ও নার্সরা ক্লিনিক ছেড়ে চলে যান। তাদের ধারণা, অপারেশনের সময় জরায়ু বা কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।

নিহতের খালা আক্তার বানু বলেন, ক্লিনিকের অবহেলার কারণে জন্মের মাত্র ২০ ঘণ্টার মধ্যেই শিশুটি এতিম হয়ে গেছে। বর্তমানে নবজাতকটি একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।

এ বিষয়ে ফেনী জেলা প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুল হাই হুমায়ুন বলেন, এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এর ফলে সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি পুরো খাতের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। তিনি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গাজী মুহাম্মদ ফৌজুল আজিম বলেন, প্রসূতির মৃত্যুর খবর পেয়ে পুলিশ ক্লিনিকটি পরিদর্শন করেছে। এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি, তবে অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফেনী জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মজিবুর রহমান জানান, বেসরকারি ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮২ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি একাধিক ধারা লঙ্ঘন করেছে। অনৈতিক ও বেআইনি কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে সিভিল সার্জনের উপস্থিতিতে ক্লিনিকটি সিলগালা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আইন অমান্য করে প্রতিষ্ঠানটি চালুর চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. রুবাইয়াত বিন করিম বলেন, এর আগেও ক্লিনিকটি সিলগালা করা হয়েছিল এবং শর্তসাপেক্ষে পুনরায় চালুর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে প্রাথমিকভাবে অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রমাণ মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বাস্থ্য বিভাগ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে।

আরও পড়ুন