শুক্রবার ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

দীর্ঘ দেড় যুগ পর দেশে ফিরলেন নিখোঁজ জাহাঙ্গীর: মা-বাবা নেই, স্ত্রীও অন্য সংসারে

রাইজিং কুমিল্লা অনলাইন

Rising Cumilla -Missing Jahangir returns home after a long decade and a half. Parents are gone, wife is in another family
দীর্ঘ দেড় যুগ পর দেশে ফিরলেন নিখোঁজ জাহাঙ্গীর: মা-বাবা নেই, স্ত্রীও অন্য সংসারে/ছবি: সংগৃহীত

নরসিংদীর চরদিঘলদী ইউনিয়নের জিতরামপুর গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম, একসময় যিনি পেশায় ছিলেন একজন জেলে। বিশাল মেঘনার বুকে মাছ ধরে জীবিকা চলত তার। সংসারে ছিলেন বাবা-মা, স্ত্রী ও চার সন্তান। কিন্তু একটি ভুল সিদ্ধান্ত তার ও তার পরিবারের জীবনে নিয়ে আসে দুর্বিষহ পরিণতি।

দালালের খপ্পরে পড়ে সন্তানসম্ভাবনা স্ত্রীকে রেখে অবৈধ পথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান জাহাঙ্গীর আলম। প্রবাসজীবনের প্রথম দিকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও একসময় তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে কোনো খোঁজ না পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা ধরে নিয়েছিলেন, হয়তো মারাই গেছেন জাহাঙ্গীর।

দীর্ঘ এই নীরবতার পর, গত ২১ অক্টোবর মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে যোগাযোগ করা হয় নরসিংদী সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা জাহান সরকারের সঙ্গে। কাউন্সেলর (লেবার) সৈয়দ শরীফুল ইসলাম জানান, এক বাংলাদেশি সেখানে ক্যাম্পে আটক রয়েছেন, যার কাছে পাসপোর্ট বা আইডি কার্ডের মতো কোনো নথি নেই। অসুস্থতার কারণে তিনি কথা বলতেও পারেন না, ফলে তার নাম-পরিচয় কিছুই জানা যাচ্ছিল না।

পরিচয় জানতে হাইকমিশন সম্প্রতি ওই ব্যক্তির ছবি দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকে নিজেদের স্বজন দাবি করলেও কেউ যথাযথ প্রমাণ দেখাতে পারেননি। ঠিক সেই সময় নরসিংদী সদরের একজন ব্যক্তি পোস্টের নিচে মন্তব্য করে জানান, লোকটি চরদিঘলদী ইউনিয়নের বাসিন্দা হতে পারেন।

হাইকমিশন যাচাইয়ের অনুরোধ জানালে ইউএনও ব্যবস্থা নেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্টজনদের সহায়তায় অবশেষে একটি পরিবারকে খুঁজে পাওয়া যায়। কথা বলে নিশ্চিত হওয়া যায়, ৬৬ বছর বয়সী এই ব্যক্তিই ১৮ বছর আগে মালয়েশিয়া গিয়ে নিখোঁজ হওয়া মৃত গিয়াস উদ্দিনের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম।

পরিবারের চরম আর্থিক অসচ্ছলতা উপলব্ধি করে ইউএনও আসমা জাহান সরকার দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় সব নথি সংগ্রহ করে হাইকমিশনে পাঠান। তিনি আর্থিক অসচ্ছলতার কথা উল্লেখ করে জাহাঙ্গীর আলমকে সরকারি ব্যয়ে দেশে পাঠানোর অনুরোধও জানান।

দীর্ঘ দেড় যুগ পর গত ৭ নভেম্বর দেশে ফেরেন জাহাঙ্গীর আলম। পরিবারের সদস্যরা বিমানবন্দর থেকে তাকে বাড়িতে নিয়ে যান।

তবে দীর্ঘ ১৮ বছর পর দেশে ফিরেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি জাহাঙ্গীর। মালয়েশিয়ায় অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আটক হয়ে বছরের পর বছর জেলের দুর্বিষহ জীবনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে তিনি হারিয়েছেন বাকশক্তিও। তিনি শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন, আবার কখনো অঝোরে কেঁদে ফেলেন।

দেশে ফিরে জাহাঙ্গীর দেখেন, তার বাবা-মা আর নেই। আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নতুন পরিবারে ঠাঁই নিয়েছেন তার স্ত্রীও।

জাহাঙ্গীরের বড় ছেলে আমান উল্লাহ বলেন, “আমরা বাবাকে পেয়ে আবেগে আপ্লুত। উনি আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন, এটাই বড় পাওয়া। আমাদের পরিবারের সবাই খুশি।”

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জাহাঙ্গীর আলমকে ২০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা ও প্রয়োজনীয় উপহারসামগ্রী দেওয়া হয়। উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে তার জন্য প্রতিবন্ধী ভাতা অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। বর্তমানে তিনি নরসিংদী জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

চরদিঘলদী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোসা. সেলিনা আক্তার জানান, তাদের পরিষদ থেকেও কিছু অর্থ দেওয়া হয়েছে এবং জাহাঙ্গীর আলমকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনি জনসাধারণকে সচেতন করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “কেউ দালালের খপ্পরে পড়ে জাহাঙ্গীর আলমের মতো যেন দেশের বাইরে না যায়, সে বিষয়ে আমরাও সবাইকে সচেতন করার চেষ্টা করব।”

নরসিংদী সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা জাহান সরকার সবাইকে সতর্ক করে বলেন, “জেনে বা না জেনে কেউই যেন জাহাঙ্গীর আলম বা তার পরিবারের মতো ভুল না করেন। দালালের খপ্পরে পড়ে অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। একটি ভুল যেন পরিবারের সারা জীবনের কান্না হয়ে না দাঁড়ায়।”

আরও পড়ুন