শনিবার ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

চাঁদপুরে শীতকালীন সবজি উৎপাদন প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন

রাইজিং কুমিল্লা ডেস্ক

Rising Cumilla -Winter vegetable cultivation
শীতকালীন সবজি চাষ/ছবি: সংগৃহীত

মেঘনা, পদ্মা, মেঘনা-ধনাগোদা ও ডাকাতিয়া নদীবেষ্টিত চাঁদপুর জেলা দেশের অন্যতম কৃষিপ্রধান অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। পলিমাটি সমৃদ্ধ এই নদী অববাহিকায় রবি, আউশ, আমন ও বোরো ধানের পাশাপাশি ব্যাপক হারে শাক-সবজি উৎপাদিত হয়। চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় না ঘটলে এবারও শীতকালীন সবজির বাম্পার ফলনের আশা করছে কৃষি বিভাগ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামার বাড়ি চাঁদপুরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি রবি মৌসুমে জেলায় মোট ৬ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ২০০ মেট্রিক টন।

ইতোমধ্যেই কৃষকরা জমি পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। জমিতে শোভা পাচ্ছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, ব্রোকলি, বেগুন, মিষ্টি কুমড়া, লাউ, শিম, লালশাক, পালংশাক, গাজরসহ নানা প্রজাতির সবজি। কৃষিবিদদের মতে, জেলায় আরও অনেক পতিত জমি রয়েছে, যেখানে সরকারি প্রণোদনা পেলে চাষাবাদের পরিধি আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব।

জেলায় সবজি উৎপাদনে প্রতিটি উপজেলাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী উপজেলাভিত্তিক আবাদ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিচে তুলে ধরা হলো:

উপজেলার নামআবাদের লক্ষ্যমাত্রা (হেক্টর)উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (মে. টন)
চাঁদপুর সদর৯৯৫২১,৯৯০
মতলব উত্তর১,২৪৫২৭,৩৯০
মতলব দক্ষিণ২৭৫৬,০৫০
হাজীগঞ্জ৯০৫১৯,৯১০
শাহরাস্তি৩৯৫৮,৬৯০
কচুয়া৪১৮৯,১৯৬
ফরিদগঞ্জ১,২৪৫২৭,৩৯০
হাইমচর৬২২১৩,৮৮৪

চাঁদপুরের কৃষি অর্থনীতির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে জেলার ১১টি বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল। বিশেষ করে মেঘনা অববাহিকায় জেগে ওঠা চরগুলোতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা কৃষি কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি পালনের পাশাপাশি সবজি উৎপাদনেও নারীরা দিন-রাত পরিশ্রম করছেন।

উল্লেখযোগ্য চরাঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে—মতলবের চর ইলিয়ট, চর কাসিম, সবজি কান্দি, ষষ্ঠ খণ্ড বোরোচর; চাঁদপুর সদরের রাজরাজেশ্বর, জাহাজমারা, লগ্নিমারা, বাঁশগাড়ি, চিড়ারচর, ফতেজংগপুর এবং হাইমচরের ঈশানবালা, চরগাজীপুর, মনিপুর, মধ্যচর, মাঝিরবাজার, সাহেব বাজার ও চরভৈরবির বাবুরচর ইত্যাদি।

এসব এলাকায় লাউ, শিম, করলা, মিষ্টি কুমড়া, কচু ও কচুর লতি, লালশাক, পালংশাক, মুলা, ঢুঁড়স, ধনিয়া পাতা ও কলমি শাক বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে।

জেলায় ধান, পাট, আলু ও সয়াবিনের পরেই এখন শাক-সবজির স্থান। লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা এই চাষে ঝুঁকছেন। গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে চিচিঙ্গা, করলা, ঢুঁড়স, বরবটি, পটোল, কাকরল, ধুন্দুল, ডাটা ও ঝিঙা অন্যতম।

চাঁদপুর সদরের কুমারডুগি, মহামায়া, দেবপুর, মাস্টার বাজার ও সুন্দরদিয়া এলাকায় কৃষকরা সম্পূর্ণ বাণিজ্যিকভাবে সবজি চাষ করছেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় এবং নৌ-পথের সুবিধার কারণে এখানকার উৎপাদিত সবজি সহজেই দেশের বিভিন্ন শহর ও বন্দরে পৌঁছে যাচ্ছে।

কৃষি বিভাগের প্রযুক্তিগত সহায়তা, উন্নত বীজ, সার ও কৃষিবিদদের পরামর্শে চাষাবাদ সহজতর হয়েছে। তবে কৃষকদের জন্য একটি বড় আক্ষেপের বিষয় হলো ব্যাংক ঋণের অভাব। নদী তীরবর্তী হওয়ায় চরাঞ্চলের কৃষকদের ব্যাংকগুলো কৃষিঋণ দিতে চায় না। কৃষকদের দাবি, সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা পেলে তারা পতিত জমিগুলোকেও চাষাবাদের আওতায় আনতে পারতেন, যা জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারত।

চাঁদপুরের সবজির গুণগত মান সম্পর্কে স্থানীয় একজন কৃষিবিদ বলেন,”চরাঞ্চলের উৎপাদিত শাক-সবজি খুবই সতেজ ও তরতাজা। কৃষকরা দিনের সবজি দিনেই বাজারে বিক্রি করে দেন বলে এতে কোনো প্রকার ফরমালিন বা রাসায়নিক মেশানোর প্রয়োজন হয় না। ফলে ভোক্তারা নির্দ্বিধায় বিষমুক্ত সবজি গ্রহণ করতে পারেন।”

আরও পড়ুন