
রমজান মাস শুরুর এক সপ্তাহ, অর্থাৎ ৭ম রোজা পার হলেই জমতে শুরু করে কুমিল্লায় ঈদের কেনাকাটা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শহরের প্রধান বিপণিবিতানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এবারের ঈদ বাজারে প্রায় শত কোটি টাকার পোশাক বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে তারা প্রস্তুত রয়েছেন।
তবে চলতি বছর ঈদবাজারের পরিবেশে যুক্ত হয়েছে নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা—সম্প্রতি দায়িত্ব নেওয়া নির্বাচিত সরকার। ফলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মধ্যেই রয়েছে বাড়তি প্রত্যাশা ও আলোচনার নতুন খোরাক।
এবার বাজারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দেশীয় পোশাকের আধিপত্য। অন্যান্য বছর ভারতীয় সিরিয়াল ও নায়িকাদের নামে বিভিন্ন পোশাক জনপ্রিয় হলেও এবার বাজারে সেগুলোর উপস্থিতি নেই। ফলে দেশীয় ডিজাইনের পোশাকের বিক্রি বেড়েছে।
বুধবার ও বৃহস্পতিবার (২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কুমিল্লা নগরীর সাত্তার খান কমপ্লেক্স, প্ল্যানেট এসআর, রূপায়ণ দেলোয়ার টাওয়ার, খন্দকার হক টাওয়ার, কিউআর টাওয়ার, ইস্টার্ণ এয়াকুব প্লাজা, এসবি প্লাজা, হিলটন টাওয়ার, নিউ মার্কেট, কুমিল্লা টাওয়ার, সিল্ভার রহমান ভিলার আড়ং ও লারিভ, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় গোমতী টাওয়ার, পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় হোয়াইট হাউজ শপিং সেন্টারে সকাল থেকে রাত অব্দি পছন্দের পোষাক ও ঈদ অনুষঙ্গ খুঁজে বেড়াচ্ছে ক্রেতারা।
বিশেষ করে পুরুষ ক্রেতার চেয়ে নারী ক্রেতার সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। পছন্দের পোশাক কিনতে ঘুরছেন এক মার্কেট থেকে অন্য মার্কেটে।

কুমিল্লা নগরীর প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়, ঝাউতলা, বাদুরতলা, চকবাজার ও রাজগঞ্জ এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী রাইজিং কুমিল্লা বলেন, শুধু ইফতারের সময় ৩০ মিনিটের বিরতি ছাড়া মধ্যরাত পর্যন্ত চলে বেচাকেনা।
এদিকে গরমকে সামনে রেখে তরুণীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে থ্রি-পিস, লেডিজ টপস, বিভিন্ন ডিজাইনের কুর্তি-প্যান্ট, শাড়িসহ বাহারি ডিজাইনের দেশি পোশাক।
হিলটন টাওয়ার শপিং কমপ্লেক্সের কুমিল্লা বাটিক কর্নার-এর স্বত্বাধিকারী বৃষ্টি রাইজিং কুমিল্লাকে জানান, ‘পবিএ ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সব ধরনের ক্রেতাদের কথা চিন্তা করে নারীদের জন্য আছে নিজস্ব ডিজাইনের থ্রি-পিস, টু পিস, লেডিজ টপস, ওড়না, শাড়ি, কুর্তি-প্যান্টসহ বাজেটের মধ্যে পোশাক। থ্রি-পিসের দাম ধরা হয়েছে ৭০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত। কুর্তি ৭০০-৮০০ টাকা। শাড়ি ৮০০-১০০০ টাকা। এক কথায় ৭০০-১৫০০ টাকার মধ্যেই ভালো মানের পোশাক পাওয়া যাচ্ছে, যা ক্রেতাদের সাধ্যের মধ্যে রয়েছে। এছাড়া ঘর সাজানোর জন্য বৈচিত্র্যময় বিছানার চাদরও আছে।’

চাঁদপুর থেকে ছোট বোন এসেছে কুমিল্লায়। আর বোনকে নিয়ে শপিং করেছেন ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী আয়েশা মনিরা। তিনি রাইজিং কুমিল্লাকে বলেন, ‘ঈদুল ফিতরে এবার ভালোই পোশাক উঠেছে কুমিল্লায়। বোনকে নিয়ে দুই দিন ধরে বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করছি।’
ছোটদের পোশাকেও রয়েছে ভিন্নতা। মেয়ে শিশুদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে লং ফ্রক ও পার্টি ফ্রক। এ ছাড়া মার্কেটগুলোতে উঠেছে লেহেঙ্গা ও লং কামিজেরও চাহিদা রয়েছে। ছেলে শিশুদের চাহিদার শীর্ষে রয়েছে সুতি টি-শার্ট ও বেবি স্যুট। এ ছাড়া বিভিন্ন ডিজাইনের প্যান্ট।
ইস্টার্ণ এয়াকুব প্লাজার শপিং কমপ্লেক্সের লেডি কেয়ার ও মা প্রসাধনী-এর স্বত্বাধিকারী রাজভীর সোহাগ রাইজিং কুমিল্লাকে জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে ইফতারের পর থেকেই বাড়ছে ক্রেতার সমাগম। আমাদের শপ গুলোতে প্রসাধনীর মধ্যে বিশেষ করে বাহারি ডিজাইনের চুড়ি থেকে শুরু করে জুয়েলারি আইটেমের বিক্রি বেড়েছে।”

অপরদিকে ঈদে তরুণদের পোশাকেও রয়েছে ভিন্নতা। তবে প্রতিবারের মতো এবারেও ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইনের পাঞ্জাবির সমাহার দেখা গেছে মার্কেটগুলোতে। তবে পাঞ্জাবি কেনার ক্ষেত্রে মার্কেটের চেয়ে কুমিল্লার খাদি দোকানগুলোতে ভিড় দেখা গেছে অনেক বেশি।
এসবি প্লাজা শপিং কমপ্লেক্সের রিলোড-এর স্বত্বাধিকারী আরিফুর রহমান বাবু রাইজিং কুমিল্লাকে জানান, ‘এবার ছেলেদের পোশাকের মধ্যে পাঞ্জাবি-পায়জামা, জগার্স প্যান্ট, শার্ট ও গেঞ্জির চাহিদা বেশি। পাঞ্জাবি আছে ১০০০-২৫০০ টাকার মধ্যে। শার্ট আছে ৫০০-১০০ টাকা ও প্যান্ট আছে ৬০০-১৫০০ টাকার মধ্যে।’
ধর্মপুর থেকে ঈদের কেনাকাটা করতে আসা এক দম্পওির সঙ্গে কথা হয় রাইজিং কুমিল্লার। এই দম্পওি জানান, ‘পরিবারের জন্য ঈদের কেনাকাটা করছি। গ্রামের বাড়িতে আত্মীয় স্বজন থাকে। আগে তাদের জন্য কেনা হচ্ছে।’
লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড “মিরর” কুমিল্লা আউটলেট-এর ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ধ্রুব রাইজিং কুমিল্লাকে জানান, “প্রতিবারের মতো “মিরর” ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে আধুনিক পোশাক নিয়ে আসে। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ক্রেতারা আসছেন পছন্দ করে কেনাকাটা করছেন।”

কুমিল্লা নগরীর লাকসাম রোডস্থ খাদি কাপড়ের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে ইফতারের পর পরই। বিশেষ করে ঈদকে সামনে রেখে খাদি পাঞ্জাবির যোগান ও চাহিদা উভয়ই বাড়ছে। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেল মিলিয়ে খাদি পাঞ্জাবির সমাহার রয়েছে নগরীর রাজগঞ্জ মনোহরপুর, কান্দিরপাড়ের দোকানগুলোতে।
কুমিল্লার চান্দিনা থেকে আসা এক ক্রেতা রাইজিং কুমিল্লাকে বলেন, ‘খাদি কাপড়ের পাঞ্জাবি কিনতে এসেছি শহরে। ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করছি ’
কয়েকজন খাদি কাপড় বিক্রেতার সঙ্গে কথা হয় রাইজিং কুমিল্লার। তারা জানান, ‘পাঁচশ থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যে খাদি পাঞ্জাবি বিক্রয় করছেন তারা। সিল্কের ব্যবহার করে খাদি পাঞ্জাবির আকর্ষণীয়তা বাড়ানো হচ্ছে বলেও জানান তারা।’
সাওার খান শপিং কমপ্লেক্সের লেডিস ফ্যাশন-এর স্বত্বাধিকারী দিদার রাইজিং কুমিল্লাকে জানান, “জমতে শুরু করেছে ঈদের কেনাকাটা। সামনে আমাদের ঈদের টার্গেট। ক্রেতারা আসছেন পছন্দ করে কিনছেন।”
অন্যদিকে শুধু বিপণিবিতান নয়, শহরের ফুটপাতের দোকানগুলোতেও বাড়ছে ঈদের কেনাকাটা। রিকশাচালক ফরিদ মিয়া জানান, পরিবারের জন্য পোশাক কিনতে এসেছেন, কিন্তু বড় মার্কেটে দাম বেশি হওয়ায় ফুটপাত থেকেই কেনাকাটা করার চেষ্টা করছেন।

কুমিল্লা টাউন হলের সামনের ফুটপাতের বিক্রেতা মোতালেব রাইজিং কুমিল্লাকে জানান, ‘শুধু স্বল্প আয়ের মানুষ না মধ্যবিত্তরাও আমাদের কাছ থেকে পছন্দের কাপড় কিনছেন। ক্রেতা বাড়ছে। তবে এবার ভিড় আগের তুলনায় বেশি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি’
এর আগে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা জেলার দোকান মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার মোঃ আনিসুজ্জামান। তিনি রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অতিরিক্ত মূল্য আদায় প্রতিরোধ এবং ভেজাল পণ্য বিক্রি বন্ধে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
তিনি আরও জানান, ঈদ উপলক্ষে জনসাধারণের নির্বিঘ্ন কেনাকাটা নিশ্চিত করতে কুমিল্লা শহরের গুরুত্বপূর্ণ বিপণিবিতান ও বাজার এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। চুরি, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধ দমন এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে। পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও আরও জোরদার করা হবে।
এছাড়া ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কসমূহে চেকপোস্ট স্থাপন, টহল কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করা করেন।









