
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আজ রবিবার (০২ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে সারা দেশে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় পবিত্র শবে বরাত পালিত হবে। হিজরি শাবান মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখের মধ্যবর্তী এই রাত মুসলমানদের কাছে ‘শবে বরাত’ বা সৌভাগ্যের রজনী হিসেবে পরিচিত। আরবি ভাষায় একে বলা হয় ‘লাইলাতুল বরাত’।
পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বাণী দিয়েছেন। একই সঙ্গে এ উপলক্ষে আগামী বুধবার সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
শবে বরাত উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এ রাতকে আল্লাহর রহমত লাভের এক অসাধারণ সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি দেশ ও জাতির কল্যাণে দোয়া করা এবং মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘মহিমান্বিত এই রাতে আমরা ইবাদত-বন্দেগি, দান-সদকার মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য ও ক্ষমা লাভ করতে পারি। আত্মসমালোচনা ও তওবার মাধ্যমে জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং গুনাহ থেকে পরিশুদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা অর্জন করতে পারি আল্লাহ–তাআলার অসীম অনুগ্রহ, বরকত ও মাগফিরাত।’
এ উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান।
মসজিদে মসজিদে ইবাদত ও দোয়া মাহফিল
পবিত্র শবে বরাতের রাতে বাসাবাড়ির পাশাপাশি মসজিদে মসজিদে নফল নামাজ, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার ও ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।
এ ছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়, ইসলামিক মিশন কেন্দ্র এবং ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমিতে আলোচনা সভা, ওয়াজ ও দোয়া মাহফিল আয়োজন করা হয়েছে।
শবে বরাতের অর্থ ও তাৎপর্য
‘শবে বরাত’ ফারসি ভাষার শব্দ। এখানে ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি, শান্তি ও সৌভাগ্য। তাই এই রাতকে সৌভাগ্যের রজনী বলা হয়। এ রাতের ইবাদতের বিশেষ ফজিলত রয়েছে।
হাদিসের আলোকে শবে বরাত
শবে বরাতের নির্দিষ্ট ফজিলত সম্পর্কে কোরআনে সরাসরি কোনো আয়াত না থাকলেও, কিছু হাদিসে এই রাতের গুরুত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে। এক বর্ণনায় এসেছে, শাবান মাসের মধ্যরাতে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন।
অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই রাতে দীর্ঘ সময় নামাজে মশগুল ছিলেন।
তবে এ রাতের সব ইবাদতই নফল। শবে বরাতের কোনো ফরজ, ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা ইবাদতের কথা হাদিসে পাওয়া যায় না। আলেমরা কোরআন ও হাদিসের আলোকে এই রাতে কোরআন তেলাওয়াত, জিকির-আজকার, দোয়া-ইস্তেগফার ও নফল নামাজ আদায়ের পরামর্শ দেন।
শবে বরাতের নফল নামাজের নিয়ম
অনেকেই শবে বরাতের নামাজ কত রাকাত ও কীভাবে পড়তে হবে জানতে চান। সাধারণত শবে বরাতের নামাজ নফল। তাই এই নামাজ আর অন্য নামাজের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।
আলেমদের মতে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রাতে দীর্ঘ সময় নিয়ে নফল নামাজ পড়েছেন। তবে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম বা সংখ্যা নির্ধারিত নেই।
নফল নামাজ পড়তে চাইলে অন্য নফল নামাজের মতোই দুই রাকাত করে আদায় করতে হবে। প্রতি রাকাতে সূরা ফাতেহার পর কোরআনের যে কোনো সূরা পড়া যাবে। এরপর নিয়ম অনুযায়ী রুকু, সিজদা ও অন্যান্য রুকন আদায় করতে হবে।
শবে বরাতের নামাজের নিয়ত
নাওয়াইতুআন্ উছল্লিয়া লিল্লা-হি তাআ-লা- রাকআতাই ছালা-তি লাইলাতিল বারা-তিন্ -নাফলি, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা-জিহাতিল্ কাবাতিশ্ শারীফাতি আল্লা-হু আকবার।
বাংলা নিয়ত:
বাংলায় নিয়ত করলে এই ভাবে করতে পারেন: ‘শবে বরাতের দুই রাকাত নফল নামাজ কিবলামুখী হয়ে পড়ছি, আল্লাহু আকবার।’
নামাজের পর দোয়া-দরুদ, তাসবি-তাহলিল, জিকির, কোরআন তেলাওয়াত, তাওবা ও ইস্তেগফার করা উত্তম।
শবে বরাতের দোয়া
এই রাতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো আলাদা দোয়া নেই। তবে রজব ও শাবান মাসে বরকত কামনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) যে দোয়া পড়তেন, তা পড়া যেতে পারে—
আরবি:
اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبٍ، وَشَعْبَانَ، وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ
উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজবা ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রমাদান
অর্থ:
হে আল্লাহ! রজব ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।
সালাতুত তাসবিহ আদায়
আলেমদের মতে, এ রাতে দীর্ঘ সময় থাকায় ফজিলতময় সালাতুত তাসবিহ আদায় করা যেতে পারে। এই নামাজ জীবনে অন্তত একবার পড়ার প্রতি তাগিদ রয়েছে।
আলেমদের মতামত
ইমাম শাফেয়ি (রহ.) বলেন, পাঁচটি রাতে দোয়া কবুল হওয়ার আশা করা যায়—এর মধ্যে শাবান মাসের মধ্যরাত অন্যতম।
ইমাম মালেক (রহ.)-এর মতে, কয়েকটি বিশেষ রাতে কল্যাণের দরজা খুলে দেওয়া হয়, যার একটি হলো নিসফে শাবানের রাত।
শবে বরাতের প্রচলিত রীতিনীতি
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শবে বরাত নানা রীতিতে পালিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক জায়গায় হালুয়া বা মিষ্টান্ন বিতরণ করা হয়। কোথাও কোথাও আতশবাজিও ফোটানো হয়, যা ধর্মীয় দৃষ্টিতে সমর্থিত নয় এবং কিছু আলেম একে বিদআত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সাধারণত এই রাতকে আলাদা করে উদযাপন করা হয় না।









