
ইরানে বর্তমানে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা, কঠোর সরকারি নজরদারি এবং প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট বন্ধের কারণে—সাংবাদিকদের জন্য খবর সংগ্রহ ও প্রেরণ অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মার্চের শুরুতে দেশটিতে ইন্টারনেট সংযোগ স্বাভাবিকের মাত্র ১ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্ল্যাকআউটটি সরকারের ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপ, যার উদ্দেশ্য বিক্ষোভ, হামলার ক্ষয়ক্ষতি এবং জনগণের তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা।
শুক্রবার (৬ মার্চ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকরা নানা বিকল্প উপায় অবলম্বন করে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্বে পাঠানোর চেষ্টা করছেন।
এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ও স্বল্প ডেটা ব্যবহার
ইন্টারনেট সীমিত হওয়ায় সাংবাদিকরা এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে সিগন্যাল এবং থ্রিমা–এর মতো অ্যাপের মাধ্যমে টেক্সটভিত্তিক সংবাদ পাঠানো হয়। এসব অ্যাপ কম ডেটা ব্যবহার করে এবং নিরাপদ যোগাযোগের সুযোগ দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা শুধুমাত্র টেক্সট পড়ে বা পাঠিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, যাতে ডেটা খরচ কম হয়।
স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যে অনেকেই স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করছেন। বিশেষ করে স্টারলিংক টার্মিনাল—যা ইরানে অবৈধ—গোপনে দেশে আনা হয়েছে। হাজার হাজার টার্মিনাল ব্যবহার করে সাংবাদিক ও অ্যাকটিভিস্টরা ইন্টারনেট সংযোগ পাচ্ছেন এবং এর মাধ্যমে ছবি, ভিডিও বা প্রতিবেদন বিদেশে পাঠাচ্ছেন।
তবে এতে বড় ঝুঁকি রয়েছে। ইরানি গোয়েন্দা সংস্থা স্যাটেলাইট সিগন্যাল ট্র্যাক করতে পারে, যার ফলে ব্যবহারকারীদের গ্রেফতারের আশঙ্কা থাকে। তাই অনেকেই ঝুঁকি এড়াতে এটি ব্যবহার করতে দ্বিধা করেন। এছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় কেউ কেউ ইরাকি সিম কার্ড ব্যবহার করে সংযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
ফুটেজ স্মাগলিং ও সিটিজেন জার্নালিজম
ইন্টারনেট না থাকায় নাগরিকদের তোলা ভিডিও বা ছবি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হয়ে উঠেছে। এসব ফুটেজ এনক্রিপ্ট করে গোপনে দেশের বাইরে পাঠানো হয়। কখনো স্যাটেলাইট লিঙ্কের মাধ্যমে, আবার কখনো অফলাইন মাধ্যমে এগুলো বিদেশি সংবাদমাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়। এভাবে নাগরিক সাংবাদিকতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিদেশ থেকে রিপোর্টিং
অনেক সাংবাদিক—বিশেষ করে নির্বাসিত ইরানি সাংবাদিকরা—দেশের বাইরে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে রিপোর্ট করছেন। তারা ডায়াসপোরা নেটওয়ার্ক, স্যাটেলাইট ইমেজারি, ওপেন-সোর্স তথ্য যাচাই এবং বিশ্বস্ত সূত্রের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করেন। তবে এ ধরনের কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় তাদের পরিবারকেও দেশে চাপ বা হুমকির মুখে পড়তে হয়।
সীমিত সরকারি অনুমোদিত সংযোগ
কিছু সরকার-সমর্থিত সাংবাদিক বা গণমাধ্যম “হোয়াইট সিম কার্ড” বা অনুমোদিত ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করতে পারেন, যা সাধারণ সেন্সরশিপের বাইরে থাকে। তবে স্বাধীন সাংবাদিকদের জন্য এ ধরনের সুবিধা পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা
বর্তমান পরিস্থিতিতে সাংবাদিকরা প্রায়ই বোমা হামলার মধ্যে কাজ করছেন, গ্রেফতারের ভয় নিয়ে চলাফেরা করছেন এবং অনেক সময় সেলফ-সেন্সরশিপ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) বলছে, ইরানে স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তথ্যপ্রবাহ সীমিত থাকায় ভুল তথ্য বা মিসইনফরমেশনও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
সব বাধা ও ঝুঁকি সত্ত্বেও সাংবাদিকরা বিভিন্ন বিকল্প উপায় ব্যবহার করে বিশ্বের কাছে ইরানের পরিস্থিতি তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যাতে তথ্যের অন্ধকার আরও ঘনীভূত না হয়।









