
ওসমান গনি, চান্দিনা প্রতিনিধি
কুমিল্লার চান্দিনায় কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে তীব্র অস্থিরতা ও নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। আড়তদারদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট, রহস্যজনক ক্রেতা সংকট এবং অস্বাভাবিক মূল্য হ্রাসের কারণে স্থানীয় চামড়ার বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। এর ফলে চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মৌসুমি চামড়া সংগ্রাহক এবং এতিমখানা ও কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে ক্ষোভ ও হতাশায় অনেক বিক্রেতা আড়তের সামনে এবং মহাসড়কের পাশে চামড়া স্তূপ করে ফেলে গেছেন। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে লবণহীন সেই কাঁচা চামড়ায় ইতিমধ্যে পচন ধরতে শুরু করেছে, যার তীব্র দুর্গন্ধ স্থানীয় জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
সরেজমিনে চান্দিনার সীমান্তবর্তী দাউদকান্দি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ইলিয়টগঞ্জ চামড়ার আড়তে গিয়ে এক করুণ চিত্র পরিলক্ষিত হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ট্রাক ও পিকআপভর্তি চামড়া নিয়ে এসে রাতভর অপেক্ষা করেও উপযুক্ত ক্রেতা পাননি বিক্রেতারা।
আড়তের আনাচে-কানাচে হাজার হাজার গরু ও ছাগলের চামড়া অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। এর ওপর শ্রমিক সংকটের অজুহাত দেখিয়ে আড়তদাররা চামড়া আনলোড করতে অস্বীকৃতি জানানোয়, অনেক ব্যবসায়ীকে নিজেদের উদ্যোগে কিংবা গাড়ির চালককে দিয়ে চামড়া খালাস করতে দেখা গেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে চামড়া নিয়ে আসা এক প্রান্তিক ব্যবসায়ী জানান, রাতভর রাস্তায় থেকে ভোররাতে আড়তে পৌঁছালেও সকাল গড়িয়ে বেলা ১১টা পর্যন্ত তিনি চামড়া বিক্রি করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত শ্রমিক না পেয়ে পিকআপ চালক নিজেই গাড়ি থেকে চামড়া নামাতে বাধ্য হন। ওই ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, আড়তে এসে কেউ চামড়া কিনতে চাচ্ছে না এবং যে দাম হাঁকা হচ্ছে, তাতে গাড়ি ভাড়ার টাকাই উঠবে না।
ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারির অভাবকে পুঁজি করে আড়তদাররা সিন্ডিকেট গঠনের মাধ্যমে ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করছেন। মাঠপর্যায়ে তীব্র প্রতিযোগিতা করে প্রতিটি গরুর চামড়া ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে সংগ্রহ করা হলেও, আড়তে আসার পর সিন্ডিকেটের কারসাজিতে সেই চামড়ার দাম মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় নেমে এসেছে।
চান্দিনা উপজেলার ছায়কোট ও মাধইয়াসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাজারের কোণে, খোলা মাঠে এবং মহাসড়কের পাশে শত শত কাঁচা চামড়া পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
লবণের অভাবে চামড়াগুলোতে পচন ধরায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা স্থানীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছায়কোট এলাকার এক মৌসুমি ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে জানান, লাভের আশায় বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেশি দামে চামড়া কিনলেও আড়তে এসে কোনো দাম পাননি। ফলে পুঁজি হারিয়ে শেষমেশ চামড়া রাস্তায় ফেলে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে মাদ্রাসাগুলোতে বিনামূল্যে পর্যাপ্ত লবণ দেওয়া হলেও, কিছু অসাধু মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সেই লবণ চামড়ায় ব্যবহার না করে কম দামে আড়তদারদের কাছে কালোবাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন। ফলে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে মাঠপর্যায়ের একটি বড় অংশের চামড়া দ্রুত নষ্ট হয়ে গেছে।
এদিকে কোরবানিদাতাদের দান করা চামড়ার ওপর নির্ভরশীল এতিমখানা ও কওমি মাদ্রাসাগুলো সবচেয়ে বড় বিপাকে পড়েছে। চান্দিনার এক মাদ্রাসা শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন যে, প্রতিবছর এই চামড়া বিক্রির টাকা দিয়ে এতিম ও অসহায় শিশুদের ভরণপোষণ এবং মাদ্রাসার খরচ চালানো হয়। এবার এতিমদের জন্য কিছু তহবিল জমার আশা থাকলেও, সিন্ডিকেটের কারণে উল্টো যাতায়াত ভাড়ার লোকসান গুনতে হচ্ছে।
সচেতন মহলের মতে, একটি প্রভাবশালী চক্র প্রতিবছরের মতো এবারও পরিকল্পিতভাবে প্রথমে মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম প্রতিযোগিতা তৈরি করে দাম বাড়িয়েছিল, যাতে সাধারণ মানুষ ও মাদ্রাসার চামড়া আড়তে চলে আসে। এরপর আড়তে চামড়া পৌঁছানো মাত্রই সুকৌশলে ক্রেতা সংকট দেখিয়ে দাম তলানিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করে স্থানীয় ইলিয়টগঞ্জ আড়তদারদের দাবি, ট্যানারি মালিকদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ডিমান্ড বা ক্রেতা না আসা, ট্যানারির বকেয়া টাকা না পাওয়া এবং সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সেই সাথে শ্রমিক সংকটে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তারা।
অন্যদিকে আড়তের আশপাশ ও সড়কের পাশে ফেলে যাওয়া চামড়া পচে পরিবেশ দূষণ তীব্র আকার ধারণ করায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা। সচেতন মহলের জোরালো দাবি, সরকার ঘোষিত চামড়ার দাম নিশ্চিত করতে এবং এই অসাধু সিন্ডিকেটের লাগাম টানতে প্রশাসন যদি এখনই কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেয়, তবে চামড়া শিল্পের এই বার্ষিক বিপর্যয় ও জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে না।
সম্পাদক : শাদমান আল আরবী | নির্বাহী সম্পাদক : তানভীর আল আরবী
ঠিকানা : ঝাউতলা, ১ম কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০। ফোন : ০১৩১৬১৮৬৯৪০, ই-মেইল : [email protected], বিজ্ঞাপন: [email protected], নিউজরুম: [email protected] © ২০২৩ রাইজিং কুমিল্লা সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত। | Design & Developed by BDIGITIC