
সঞ্জয় শীল,নবীনগর,ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
মানুষের সাথে স্রষ্ট্রার যোগাযোগ আর গুরু শ্রীমৎ আনন্দ মহারাজের দয়াময় নামের সাধক, চট্টগ্রামের মাইজভান্ডার দরবার শরীফের পীরের সান্নিধ্যে গিয়ে সূফী ভাবনার প্রেরণালাভের অধ্যাত্বিক কবি মনোমোহন দত্তের ১৪৮ তম জন্মোৎসব পালিত হচ্ছে আজ। গত কাল থেকে আজ দুই দিন ব্যাপি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার সাতমোড়া ইউনিয়নের সাতমোড়া গ্রামে সাধক মনোমোহন দত্তের জন্মভিটের আনন্দ আশ্রমে পালিত হচ্ছে এই উৎসব। প্রতি বছরের ন্যায় বাংলায় ১০ মাঘ ও ১১ মাঘ ও খ্রিস্টীয় ২৩ জানুয়ারি ও ২৪ জানুয়ারি দুই দিন সাধকের জীবন দর্শন নিয়ে আলোচনা ও মলয়া সংগীতের মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে সাধকের সমাধি মন্দিরকে ঘিরে।
ক্ষণজন্মা এই সাধক মাত্র ৩১ বছরের জীবদর্শায় অমর হয়ে আছেন মানুষের একাধিক পথের একটি মেলবন্ধন করে কেবল একই সুরে ভালোবাসা আর সৌহাদ্যে নিয়ে স্রষ্টার খোঁজ, সাধনা, মলয়া সংগীত ও গুরু-শীষ্যের ভাব।
জীবনের গন্তব্য, সাধনা ও স্রষ্ট্রাকে খুঁজতে গিয়ে যে কবিতা-গান রচনা করে গেছেন তিনি তাকে “মলয়া” নামে নামকরণ করে গেছেন। মলয়া সংগীতের “মলয়া” নামকরণ নিয়ে ভক্তদের গুরু-শীষ্যের নামের আবেগ (মনোমোহনের ‘ম’, লবচন্দ্রের ‘ল’ এবং আফতাবউদ্দিনের ‘য়া’ নিয়ে ‘মলয়া’ ) নিয়ে বহুল প্রচলিত হলেও আদতে তা মলয়া বাতাস থেকে নেয়া। শীতের শেষে বসন্তের যে বাতাস আমাদের আন্দোলিত করে তোলে। যখন নতুন জীবন সঞ্চার হয়। ফুলে ফুলে ভরে উঠে গাছ-গাছালী। মলয়া বাতাসের মতন মলয়া গানও মানুষকে আন্দোলিত করে, নতুন জীবনের সঞ্চার করে চলেছে।
মলয়া সংগীত, প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আফতাব উদ্দিন খাঁর কন্ঠ ধরে ছড়িয়ে পড়েছিলো উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে। একাধিক জীবনী গ্রন্থ থেকে জানা যায়, শান্তিনিকেতনে ওস্তাদ আফতাব উদ্দিন খাঁর কন্ঠে মলয়া সংগীত শুনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “কবিরা কল্পনা করেন আর সাধকরা চোখে দেখেন।”
২০১৮ সালে মুক্তি প্রাপ্ত একাধিক আর্ন্তজাতিক পুরস্কার প্রাপ্ত সিনেমা “কমলা রকেট” এ মনোমোহন দত্তের “মনোমাঝে” গানটি ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। এছাড়া একাধিক রেডিও-টিভি শো, বাউল গান, নাটক-সিনেমায় মনোমোহন দত্তের মলয়া সংগীতের উক্তি ও গান হৃদয় ছোঁয়ে গেছে।
তাঁর রচিত মলয়া গানের সুর-লয়, স্বরলিপি নিয়ে অসাধারণ ফিচার ছাপা হয়েছিলো “সাপ্তাহিক ২০০০” ম্যাগাজিনে। আজো তা সমানতালে চলছে তাঁর গবেষনা ও সেমিনার।
‘মলয়া’ কাব্যগ্রন্থে গানের সংখ্যা মোট ৪২৬টি তার মধ্যে ‘মলয়া’ কাব্যগ্রন্থ প্রথম খণ্ডে ২৮৭টি ও দ্বিতীয় খণ্ড ১৩৯টি মরমী গান লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাঁর রচিত মলয়া গানগুলোতে বেশির ভাগ সুর দিয়েছিলেন সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ’র বড় ভাই ফকির আফতাব উদ্দিন খাঁ। মহর্ষি মনোমোহন দত্তের অন্যান্য রচনাবলী মধ্যে সুন্দর ও গভীর ভাবব্যঞ্জক প্রায় ১০০০ কবিতাপূর্ণ ‘তপোবন’, ‘উপবন’, ‘নির্মমাল্য’ তিনটি কাব্য গ্রন্থ রয়েছে। আত্মতত্ত্ব সাধনের জন্য তিনি লিখেছেন ‘প্রেম ও প্রীতি’, ‘পথিক’, ‘সত্যশতক’, ‘ময়না’, ‘যোগ প্রণালী’, ‘উপাসনা তত্ত্ব এবং ঋণী’। তিনি আরও লিখেছেন ‘সর্বধর্ম তত্ত্বসার’ নামে অতিজটিল তত্ত্বসম্পর্কিয় প্রায় ২০০টি রচনাবলী পুস্তক। সাধক কবি মনোমোহন দত্তের আশ্রমে ও অনলাইনে অর্ডার করে পেতে পারেন এই সব বইগুলি।
শুধু মলয়া গান নয়, নিজের অধ্যাত্বিক সাধনার জীবন ও জীবনী লিখে গেছেন তিনি নিজেই। তাঁর শীষ্য ও ভাব শীষ্যের মাঝে সেই জীবন ও ভাব ছড়িয়ে পড়েছে জীবনের প্রয়োজনে। এক্ষেত্রে মনোমোহনের একটি গান উল্লেখ্য -
“বিবেক বুদ্ধি হারাইয়ে হাত বাড়ায়ে ডাকিস কারে
লাগ পাবি না অনেক দূরে,
যার জন্য তোর ডাকাডাকি, তার সনে তোর মাখামাখি
খুলে দেখ তোর জ্ঞানের আঁখি বাকির ঘরে ওশল পড়ে।”
তিনি ছিলেন নিজ সময়ের কুসংস্কার আর কুপ্রথার বিরুদ্ধে একজন প্রতিবাদী অসম্প্রাদায়িক চেতনার মানুষ। যিনি সম্মিলন ঘটিয়েছেন মানুষের ভ্রাতৃত্বের। জীবদর্শায় গ্রামের সহজ-সরল মানুষের চিকিৎসা সেবা দিতেন নিজ জ্ঞানে। আসর বসতো, হতো বন্ধু প্রতিম শীষ্যদের সাথে সাধনার বাহাস। জীবনের লীলা রহস্য নিয়ে নানা দিকের আলোচনা-খন্ডনের পালা।
প্রতি বছর তাঁকে ভালোবেসে দেশ-বিদেশের সাধক, কবি, শিল্পী, সাংবাদিক-গবেষকরা ভিড় জমান আশ্রমে। গৌতম বুদ্ধের বোধি বৃক্ষের মতন মনোমোহন দত্তের বিল্ব বৃক্ষ (বেল গাছের তল) কে ঘিরে সাধারণ মানুষের মানত-ইচ্ছা, ভালোবাসায় জ্বলে মোমবাতির প্রদিপ ও আগরের ধোঁয়া।
সম্পাদক : শাদমান আল আরবী | নির্বাহী সম্পাদক : তানভীর আল আরবী
ঠিকানা : ঝাউতলা, ১ম কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০। ফোন : ০১৩১৬১৮৬৯৪০, ই-মেইল : [email protected], বিজ্ঞাপন: [email protected], নিউজরুম: [email protected] © ২০২৩ রাইজিং কুমিল্লা সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত। | Design & Developed by BDIGITIC