মঙ্গলবার ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬

সাইকেলের চাকায় ঘোরে মাইনুলের সংসার: ষাটোর্ধ্ব বয়সেও বিরামহীন জীবন যুদ্ধ

ওসমান গনি, চান্দিনা, প্রতিনিধি

Rising Cumilla - Mainul's family revolves around the wheels of a bicycle- A relentless battle for life even at the age of sixty
সাইকেলের চাকায় ঘোরে মাইনুলের সংসার: ষাটোর্ধ্ব বয়সেও বিরামহীন জীবন যুদ্ধ / ছবি: প্রতিনিধি

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার আটরইশা গ্রাম থেকে কুমিল্লার চান্দিনা—মানচিত্রের এই বিশাল দূরত্ব কেবল মাইলের হিসেবে নয়, বরং এটি একজন ষাটোর্ধ্ব মানুষের জীবন সংগ্রামের এক দীর্ঘ উপাখ্যান। মাইনুল ইসলাম, যার বয়স এখন জীবনের পড়ন্ত বিকেলে, অথচ এই বয়সেও তার বিশ্রামের ফুরসত নেই। শরীরে বার্ধক্যের ছাপ পড়লেও মনের জোরে তিনি এখনও প্রতিদিন চাকা ঘুরিয়ে চলেছেন এক পুরনো সাইকেলের, আর সেই সাইকেলের সাথেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে একটি আস্ত পরিবারের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। মাইনুলের এই জীবন যুদ্ধ শুরু হয় প্রতিদিন খুব ভোরে, যখন অধিকাংশ মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কুমিল্লার চান্দিনা ও দেবিদ্বার উপজেলার মেঠোপথ থেকে শুরু করে পিচঢালা রাজপথ, সবখানেই মাইনুল ইসলামের উপস্থিতি চোখে পড়ে। পেশায় তিনি একজন ভ্রাম্যমাণ প্লাস্টিক বিক্রেতা। কিন্তু এই পেশার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় এসে টিকে থাকার এক কঠিন এবং রূঢ় বাস্তবতা।

মাইনুল ইসলাম জানান, তিনি সরাসরি ঢাকা থেকে পাইকারি দরে প্লাস্টিকের বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্য যেমন, বালতি, গামলা, বদনা, মগ ও ঝুড়ি কিনে আনেন। এই মালামালগুলো তিনি চান্দিনা সদরে ভাড়া করা একটি ছোট গোডাউনে মজুত রাখেন। সেখান থেকেই প্রতিদিন সকালে তার সাইকেলটি মালামালে ঠাসা হয়ে ওঠে। মাইনুলের এই যাযাবর জীবনের গল্পটি মূলত ত্যাগের। চান্দিনার বদরপুর বাজারে যখন মাইনুলের সাথে দেখা হয়, তখন তার কপালে জমেছে শ্রাবণের ধারার মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম। সাইকেলের হ্যান্ডেল আর পেছনের ক্যারিয়ারে প্লাস্টিকের স্তূপ এমনভাবে বাঁধা যে, মানুষটিকে দূর থেকে প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। তবুও প্যাডেলে তার পা দুটি অবিরাম চলছে। মাইনুল ইসলাম জানান, তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ও অনুপ্রেরণা হলো তার বৃদ্ধা মা। বাবা অনেক আগেই গত হয়েছেন, কিন্তু মা এখনও বাড়িতে তার ফেরার পথ চেয়ে থাকেন। মাইনুলের নিজের সংসারে রয়েছে তিন মেয়ে ও দুই ছেলে। জীবনের প্রতিটি রক্তবিন্দু জল করে তিনি তার তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। এখন দুই ছেলের পড়াশোনা আর পরিবারের ভরণপোষণের গুরুদায়িত্ব তাকে একাই সামলাতে হচ্ছে।

এক জেলা থেকে অন্য জেলায় এসে কাজ করার যন্ত্রণা অনেক। নিজের আপনজনদের ছেড়ে দূর পরবাসে একাকী মেস জীবন কাটানো মাইনুলের জন্য মোটেও সহজ নয়। তিনি জানান, বাড়িতে অভাব লেগেই থাকে, স্থানীয়ভাবে ভালো কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় এবং সংসারের চাকা সচল রাখতে তিনি এই কষ্ট সয়ে যাচ্ছেন। একা হাতে মালামাল কেনা, গোডাউন সামলানো এবং সারা দিন গ্রাম থেকে গ্রামে ফেরি করে বেড়ানো, সব মিলিয়ে শরীরের ওপর দিয়ে প্রচণ্ড ধকল যায়। তবুও মাইনুলের চোখে মুখে এক অদ্ভুত তৃপ্তি দেখা যায় যখন তিনি বলেন যে, তিনি কারও কাছে হাত পাতেন না। নিজের হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে অর্জিত টাকায় যখন সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেন, তখন সব ক্লান্তি নিমেষেই দূর হয়ে যায়। তার এই সততা আর নিষ্ঠা এলাকাবাসীর কাছেও তাকে এক অনন্য সম্মানের আসনে বসিয়েছে।

মাইনুলের সারা দিনের আয় একেক দিন একেক রকম হয়। খরচাপাতি বাদ দিয়ে কোন ৫০০ টাকা আবার কোনদিন ৭০০ টাকা থাকে। খুব একটা বেশি নয়। কোনো দিন ভালো বিক্রি হয়, আবার কোনো দিন খালি হাতেই ফিরতে হয় গোডাউনে। জিনিসের দাম বাড়লে তার লাভের অংক কমে আসে, কিন্তু ক্রেতাদের কাছে দাম বেশি চাইলে বিক্রি কমে যাওয়ার ভয় থাকে। এই টানাপোড়েনের মাঝেই তাকে হিসাব মেলাতে হয় ঘর ভাড়া, নিজের খাওয়া এবং বাড়িতে টাকা পাঠানোর। মাইনুল ইসলামের এই সংগ্রামী জীবন আমাদের সমাজের সেইসব অদৃশ্য নায়কদের কথা মনে করিয়ে দেয়, যারা প্রচারের আলোয় আসেন না কিন্তু সমাজ ও পরিবারের ভিত ধরে রাখেন। বয়সের ভারে মেরুদণ্ড কিছুটা নুয়ে পড়লেও তার আত্মমর্যাদা বোধ এখনও আকাশচুম্বী। তার মতে, পরিশ্রমের মধ্যে কোনো লজ্জা নেই, লজ্জা হলো অলসতায়। কুমিল্লার তীব্র রোদ কিংবা হুটহাট বৃষ্টি, কোনো কিছুই মাইনুলের পথচলা থামাতে পারে না। প্লাস্টিকের মগ-বালতির সেই চিরচেনা টুংটাং শব্দই যেন তার জীবনের বিরতিহীন সংগীত।

মাইনুলের জীবনের এই গল্পটি কেবল একজন সাধারণ ফেরিওয়ালার গল্প নয়, এটি হলো হার না মানা এক বাবার গল্প, একজন দায়িত্বশীল সন্তানের গল্প। অভাব তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি, বরং তাকে করে তুলেছে আরও সাহসী ও ধৈর্যশীল। যখনই তার ক্লান্ত লাগে, তখনই তিনি তার সন্তানদের মুখ আর বৃদ্ধা মায়ের হাসির কথা ভাবেন, আর অমনি তার শরীরে নতুন শক্তির সঞ্চার হয়। বদরপুর বাজার ছাড়িয়ে মাইনুল যখন তার সাইকেল নিয়ে অন্য কোনো এক মেঠোপথে হারিয়ে যান, তখন পেছনের ধুলোবালি যেন তার দীর্ঘশ্বাসের সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। মাইনুল ইসলামরা বেঁচে থাকেন তাদের কর্মে, তাদের সীমাহীন ত্যাগে। আমাদের চারপাশের এই সাধারণ মানুষগুলোই আসলে অসাধারণ সাহসের জীবন্ত প্রতীক। মাইনুল ইসলামের মতো মানুষেরা যুগ যুগ ধরে আমাদের শিখিয়ে যান যে, জীবন যতোই কঠিন হোক, পরিশ্রম আর সততার সাথে লড়াই করলে জীবনের শেষ বেলাতেও মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা সম্ভব। এই মানবিক যোদ্ধা মাইনুলের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা, যিনি শত কষ্টের মাঝেও জীবনের চাকা সচল রেখেছেন কেবল ভালোবাসার টানে।

আরও পড়ুন