
RCumilla
অভাবের ধূসর ক্যানভাসে স্বপ্নের বর্ণিল রঙ এঁকে শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের সিংহাসনে পৌঁছানো এক লড়াকু তরুণের নাম মোঃ শামীম আহমেদ। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ৭২তম স্থান অধিকার করে সহকারী জজ (সিভিল জজ) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।
পরপর দু’বার মৌখিক পরীক্ষার কঠিন দুয়ার থেকে ফিরে এলেও আশা হারাননি; তৃতীয়বারের অবিচল সাধনায় ছিনিয়ে এনেছেন কাঙ্ক্ষিত বিজয়। কুমিল্লার হোমনা উপজেলার চান্দেরচর গ্রামের কৃষক পিতা মোঃ জামির হোসেন ও গৃহিণী মাতা ছুরিয়া বেগমের এই কৃতি সন্তান প্রমাণ করেছেন—সংগ্রামের আগুনে পুড়েই খাঁটি সোনা তৈরি হয়।
সম্প্রতি ১৮তম বিজেএস জয়ের সেই দুর্গম কিন্তু অনুপ্রেরণাদায়ী পথের আখ্যান শুনিয়েছেন তিনি। রাইজিং কুমিল্লার নির্বাহী সম্পাদক তানভীর আল আরবী-র নেওয়া বিস্তৃত সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো—
রাইজিং কুমিল্লা: শুরুতেই আপনার শৈশব, গ্রামীণ জীবন ও বেড়ে ওঠার সেই স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা বিস্তারিত জানতে চাই?
মোঃ শামীম আহমেদ: আমার শৈশব কেটেছে হোমনার চান্দেরচর গ্রামের ধূলিমাখা পথ আর মেঘনা অববাহিকার প্রকৃতির উদার কোলে। প্রকৃতিই ছিল আমার প্রথম শিক্ষক। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’র অপুর মতোই ছিল সেই দিনগুলো পুকুরে দীর্ঘক্ষণ সাঁতার কেটে স্নান করা, শান্ত বিলের জলে নেমে শালুক-শাপলা তোলা, মেঘনার বুকে নৌকায় ভেসে বেড়ানো, পাখির বাসা খোঁজা কিংবা ঘুড়ি উড়িয়ে আকাশের সীমানা মাপা। যৌথ পরিবারের নিবিড় বন্ধন আর মা-বাবার স্নেহের শাসনে শৈশবের প্রথম ৫–৬টি বছর কেটেছিল এক অদ্ভুত মাধুর্যে।
তারপর এল স্কুলের পাঠ। চান্দেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির দিনে আমার পুরো নাম লিখতে না পারায় আমাকে প্রথম শ্রেণিতে বই দেওয়া হচ্ছিল না। শিশুর অভিমানী হৃদয়ে সেদিন তীব্র কান্না পেয়েছিল; বাড়ি ফিরে আম্মাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে তবেই বই এনেছিলাম। তবে নিজ গ্রাম চান্দেরচরে বেশিদিন থাকা হয়নি। চলে গেলাম মনিপুর গ্রামে, নানির পরম স্নেহের আশ্রয়ে। নানি আমাকে এমন ভালোবাসতেন, যেন আমাকে চোখের আড়াল করতেই পারতেন না।
মনিপুর থেকেই মূলত আমার শিক্ষাজীবনের বুনিয়াদ রচিত হয়। ভর্তি হলাম নারায়ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কেটেছে অজস্র স্মৃতি। সত্যি বলতে, শুরুর দিকে পড়াশোনায় একেবারেই মন বসত না। প্রচলিত একটি উক্তি আছে —“শৈশব হলো জীবনের সেই সোনালী প্রভাত, যেখানে কোনো নিয়ম মানার চেয়ে নিয়ম ভাঙাই যেন একমাত্র আনন্দ।” আমিও তখন স্কুল থেকে পালাতাম, ফাঁকি দিতাম। মা আমাকে হাত ধরে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসতেন, আর আমি সুযোগ বুঝে স্যারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কেটে পড়তাম। ফলে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনোমতে টেনেটুনে পাস করেছিলাম।
জীবনের মোড় ঘুরল চতুর্থ শ্রেণিতে ওঠার পর। বার্ষিক পরীক্ষার কিছুদিন আগে হাবিব মামা পরম যত্নে আমাকে পড়াতে শুরু করলেন। তাঁর হাত ধরেই পড়ার প্রতি আমার ভেতরের সুপ্ত অনুরাগ জেগে উঠল। ফলাফল এমন অভাবনীয় হলো যে, ক্লাস ফোরের সাত রোলের ছাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে গিয়ে এক রোল হয়ে গেল! এরপর পঞ্চম শ্রেণিতে শ্রদ্ধেয় নাজমা ম্যাডাম, মমিনুল হক স্যার ও মজিবুর স্যারদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে ২০০৬ সালে প্রথম ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেলাম। মমিনুল হক স্যার ৫ম শ্রেণির শুরুতেই অন্য স্কুলে ট্রান্সফার হয়ে যায়।
আমি কোনো সোনায় মোড়ানো প্রাসাদে কিংবা রূপার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাইনি। বাবা ছিলেন মাটির সঙ্গে লড়াই করা এক সাধারণ কৃষক, মা আত্মনিবেদিত গৃহিণী। দারিদ্র্যের তীব্র কষাঘাত, সংসার টিকিয়ে রাখার লড়াই খুব কাছ থেকে দেখেছি। কিন্তু একটি অমোঘ বাণীকে মনে ধারণ করেছিলাম—“একটি শান্ত সমুদ্র কখনো দক্ষ নাবিক তৈরি করতে পারে না।” জীবনের এই প্রতিকূলতাই আমাকে ইস্পাতকঠিন করেছে। হাটে গিয়ে শাক-সবজি, জমির ফসলের ফলন, মাছ আর দুধ বিক্রি করেছি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বন্ধুরা তো আমাকে আদর করে ‘মাছ ব্যবসায়ী’ বলেই ডাকত। এই জীবনই আমার শ্রেষ্ঠ পাঠশালা। ম্যাক্সিম গোর্কির ‘আমার ছেলেবেলা’র মতো আমি বিশ্বাস করি—শৈশবে গ্রাম ও সমাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাকে যা শিখিয়েছে, তা পৃথিবীর নামীদামী শত শত উপন্যাসের চেয়েও গভীর। পরবর্তীতে ঘাড়মোড়া এ.কে.এম. ফজলুল হক মোল্লা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণিতে পুনরায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাই এবং ২০১২ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করি। মনিপুরের মাটি, মানুষ এবং আমার শিক্ষকদের কাছে আমার ঋণ চিরন্তন।
রাইজিং কুমিল্লা: পড়াশোনার দীর্ঘ এই কণ্টকাকীর্ণ যাত্রায় কোনো প্রতিবন্ধকতা এসেছিল কি?
মোঃ শামীম আহমেদ: আমার মা-বাবা প্রথাগত শিক্ষার আলো দেখার সুযোগ পাননি। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি “শিক্ষার আলো যদি একবার চিত্তে পৌঁছায়, তবে কোনো বাধাই চিরস্থায়ী হতে পারে না।” ঠিক তেমনই মা-বাবা নিজেরা প্রথাগত বিদ্যা না পেলেও তাঁদের অন্তরে তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল—তাঁদের সন্তান যেন বিদ্যাবলে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। আর্থিক দৈন্য আমাদের নিত্যসঙ্গী ছিল, কিন্তু আমার পড়াশোনার প্রশ্নে তাঁরা কখনো এক পা-ও পিছিয়ে যাননি। নিজেদের রক্ত জল করা সবটুকু উজাড় করে দিয়ে আমাকে পড়িয়েছেন।
তাছাড়া পথের বাঁকে বাঁকে বহু শুভানুধ্যায়ীর হাত পেয়েছি। মনিপুরের শ্রদ্ধেয় শাকির ভাই সার্বক্ষণিক আমার খোঁজ নিতেন, আলোর দিশা দেখাতেন। আমার শিক্ষকেরা সন্তানের মতো ভালোবেসে পরম স্নেহে পথ দেখিয়েছেন। আশা কবিতার সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কালজয়ী চরণের মতো—
“মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে, হারা শশীর হারা হাসি অন্ধকারেই ফিরে আসে।”
মা-বাবার দোয়া আর শিক্ষকদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সামনে কোনো অভাব বা সামাজিক প্রতিকূলতাই আমাকে অবরুদ্ধ করতে পারেনি।
রাইজিং কুমিল্লা: মনের গভীরে বিচারক হওয়ার স্বপ্নের বীজটি প্রথম কবে উপ্ত হয়েছিল?
মোঃ শামীম আহমেদ: এই স্বপ্নের বীজটি বুনেছিলেন আমার আম্মা। মামার বাড়ির পাশের কৃষ্ণপুর গ্রামের শ্রদ্ধেয় মোজাম্মেল মামাকে সবাই এক নামে চিনত, শ্রদ্ধা করত। মা প্রায়ই তাঁর দৃষ্টান্ত টেনে আমাকে বলতেন “তোমাকেও তোমার মোজাম্মেল মামার মতো বড় ম্যাজিস্ট্রেট হতে হবে, মন দিয়ে পড়াশোনা করো।” শৈশবে ম্যাজিস্ট্রেট বা জজ শব্দের অন্তর্নিহিত আইনি দর্শন বুঝতাম না, কেবল এতটুকু বুঝতাম মা আমাকে সমাজে ন্যায় ও আস্থার এক সর্বোচ্চ আসনে দেখতে চান।
এরপর যখন উচ্চশিক্ষার জন্য কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হলাম, তখন আইনের বিশাল ব্যাপ্তি আমার চিন্তাচেতনা বদলে দিল। ফার্স্ট ইয়ারে একদিন এক ক্লাসে একজন শ্রদ্ধেয় বিচারক আমাদের প্রশ্ন করেছিলেন“ভবিষ্যতে তোমরা কে কী হতে চাও?” আমি কোনো দ্বিধা না রেখে অবচেতন মনেই বুক ফুলিয়ে বলে উঠেছিলাম “আমি দেশের প্রধান বিচারপতি হতে চাই!” পুরো ক্লাসে তখন পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল। স্যার মৃদু হেসে পরম স্নেহে বলেছিলেন “আগে সহকারী জজ হও, বিচারাসনে বসো; একাগ্রতা থাকলে তোমার কাঙ্ক্ষিত চূড়ায় পৌঁছানো অসম্ভব নয়।” সেই দিন থেকেই বিচারক হওয়ার স্বপ্ন আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে যায়।
রাইজিং কুমিল্লা: বিজেএস-এর জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি কবে থেকে এবং কীভাবে শুরু করেছিলেন?
মোঃ শামীম আহমেদ: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৯ সালে এলএল.বি. (অনার্স) সম্পন্ন করার পর থেকেই পুরোদমে বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতিতে আত্মনিয়োগ করি। একদিকে ২০২০ সালে এলএল.এম.-এর প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন, অন্যদিকে বিজেএস-এর সুবিশাল সিলেবাস দুটোকে একসূত্রে গেঁথে নিয়ে এক দ্বৈত লড়াই শুরু হয়েছিল তখন।
রাইজিং কুমিল্লা: প্রস্তুতির সময় আপনার পড়াশোনার দৈনন্দিন রুটিন কেমন ছিল?
মোঃ শামীম আহমেদ: ঘড়ির কাঁটা মেপে বাঁধাধরা রুটিন মেনে পড়ার বিলাসিতা আমার ছিল না। বেঁচে থাকার লড়াই ও নিজের খরচ জোগাতে আমাকে নিয়মিত টিউশনি করতে হতো। তবে ফ্রান্সিস বেকন বলেছিলেন“জ্ঞানই শক্তি।” তাই সময় পেলেই আইনের গভীরে ডুব দিতাম। পড়ার পরিমাণের চেয়ে পড়ার গুণগত মানকে আমি সবসময় প্রাধান্য দিয়েছি। জটিল ধারাগুলো অন্ধের মতো মুখস্থ না করে সেগুলোর অন্তর্নিহিত দর্শন, আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্য ও প্রায়োগিক দিক বোঝার চেষ্টা করতাম। যেখানেই সামান্য অবসর মিলত, আইনের বেয়ার অ্যাক্ট ও সহায়ক বইগুলোই হয়ে উঠত আমার ধ্যান ও জ্ঞান।
রাইজিং কুমিল্লা: নতুন প্রার্থীদের জন্য বিজেএস প্রস্তুতি নিয়ে আপনার সার্বিক পরামর্শ কী থাকবে?
মোঃ শামীম আহমেদ: বিজেএস কোনো ক্ষণিকের আবেগ বা আকস্মিক সাফল্যের খেলা নয়। এটি একটি সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদী সাধনা।
লক্ষ্য স্থির করা: এলএল.বি. অধ্যয়নের শুরু থেকেই দৃঢ় লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগোতে হবে।
মূল আইনে দখল: মূল আইনগুলো (Bare Acts) ধারাভিত্তিক এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যাসহ পড়তে হবে। অন্ধের মতো মুখস্থ না করে উচ্চ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নজির (Case Laws) ও ল্যান্ডমার্ক রায়গুলোর ওপর স্পষ্ট দখল থাকতে হবে।
গ্রুপ স্টাডি: একা পড়ার চেয়ে সহপাঠীদের সাথে সম্মিলিত আলোচনা বা গ্রুপ স্টাডি অত্যন্ত কার্যকর। এতে আইনের জটিল তাত্ত্বিক দিকগুলো সহজে স্মৃতিতে স্থায়ী হয়।
রাইজিং কুমিল্লা: প্রিলিমিনারি উত্তীর্ণ হওয়ার পর লিখিত পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি কীভাবে নেওয়া উচিত?
মোঃ শামীম আহমেদ: লিখিত পরীক্ষা হলো একজন প্রার্থীর আইনি মেধা, ভাষা ও বিশ্লেষণের আসল অ্যাসিড টেস্ট। প্রিলিমিনারি পাসের পর দিকভ্রান্ত না হয়ে বিগত বছরের প্রশ্নাবলি নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো বাছাই করে নিতে হবে।
সাংবিধানিক আইন, পারিবারিক আইন ও বিশেষ আইনের মতো ৩০০ নম্বরের অংশে নিখুঁত প্রস্তুতির মাধ্যমে বেশি নম্বর তোলার লক্ষ্য রাখতে হবে।
দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের প্রতিটি স্টেজ বা ধাপ ক্রমানুসারে সাজিয়ে ধারার সাথে সংযোগ তৈরি করে পড়তে হবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যুক্তিগ্রাহ্য ও সাবলীলভাবে উত্তর উপস্থাপনের জন্য নিয়মিত লেখার অভ্যাস (Free-hand writing) গড়ে তুলতে হবে।
রাইজিং কুমিল্লা: ভাইভার প্রস্তুতি কেমন হওয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
মোঃ শামীম আহমেদ: ভাইবা বোর্ড মূলত একজন প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, উপস্থিত বুদ্ধি ও আইনি দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতা পরিমাপ করে। ভাইভার জন্য সম্পূর্ণ নতুন তথ্য খোঁজার চেয়ে প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার জন্য পঠিত আইনগুলোই বারবার গভীর অভিনিবেশ সহকারে রিভিশন দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে মৌলিক আইনগুলোর প্রায়োগিক দিক, আদালতের কার্যপ্রণালী, সাম্প্রতিক আলোচিত রায় এবং সমসাময়িক জাতীয় ইস্যুগুলোর ওপর স্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে। ভাইভা বোর্ডে আত্মবিশ্বাস ও সততা বজায় রাখাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
রাইজিং কুমিল্লা: পূর্বের দু’বার ব্যর্থতার পর তৃতীয়বারে এসে মেধা তালিকায় ৭২তম স্থান অর্জন করলেন—এই মাহেন্দ্রক্ষণে আপনার অনুভূতি কেমন?
মোঃ শামীম আহমেদ: আলহামদুলিল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা মহান প্রতিপালকের। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি “ধৈর্যই সমস্ত সাফল্যের গোপন চাবিকাঠি।” পরপর দু’টি মৌখিক পরীক্ষার দুয়ার থেকে ছিটকে পড়েও আমি কখনো ভেঙে পড়িনি বা হাল ছাড়িনি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়—
“বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়।”
পরিশ্রমের ঘাম, বিনিদ্র রজনীর আত্মত্যাগ আর অসীম ধৈর্যের ফল মহান আল্লাহ এভাবে ফিরিয়ে দেবেন, তা ভেবে বুকটা কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। এ আনন্দ কেবল আমার একার নয়, এ আনন্দ আমার মা-বাবার আজীবন লড়াই ও প্রার্থনার সার্থকতা।
রাইজিং কুমিল্লা: দীর্ঘ এই কণ্টকাকীর্ণ যাত্রায় আপনার মূল অনুপ্রেরণা কারা ছিলেন?
মোঃ শামীম আহমেদ: আমার জীবনের প্রতিটি বাঁকে যাঁরা আলোর প্রদীপ হয়ে পাশে ছিলেন, তাঁরা হলেন আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ যাঁরা আমার মেধার বিকাশ ঘটিয়েছেন; আমার বাবা ও মা যাঁদের নীরব ত্যাগ, ঘাম ও দোয়ায় আমার অস্তিত্ব গড়ে উঠেছে; এবং আমার সহধর্মিণী যে আমার প্রতিটি অনিশ্চয়তা ও হতাশার মুহূর্তে আস্থার সুশীতল ছায়া হয়ে সাহস জুগিয়েছে। তাঁদের সবার নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই আমার এই অর্জনের মূল ভিত্তি।
রাইজিং কুমিল্লা: আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। একজন শিক্ষক হিসেবে আপনার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে কী নির্দেশনা দিতে চান?
মোঃ শামীম আহমেদ: আমি সবসময় বিশ্বাস করি আইন কোনো নিষ্প্রাণ বা কাগজের জড়বস্তু নয়, আইন এক জীবন্ত দর্শন। আমেরিকান সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত বিচারপতি অলিভার ওয়েন্ডেল হোমস জুনিয়র বলেছিলেন “আইনের জীবন যুক্তি নয়, এর জীবন হলো অভিজ্ঞতা।” তাই শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার দ্ব্যর্থহীন বার্তা হলো আইনকে শুধু পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার জন্য মুখস্থ কোরো না; আইনকে সমাজের বাস্তবতার সাথে, সাধারণ মানুষের কান্না ও দুঃখ-বেদনার সাথে মিলিয়ে পড়তে শেখো। তবেই তোমরা মানবিক, দায়বদ্ধ ও আদর্শ আইনি ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে উঠবে।
রাইজিং কুমিল্লা: একজন বিচারক হিসেবে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ব্রত কী?
মোঃ শামীম আহমেদ: বিচারকের আসনটি কোনো বৈষয়িক ক্ষমতা প্রদর্শনের পদ নয়, এটি ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক পবিত্র আমানত। পবিত্র আল-কোরআনের সুরা নিসার নির্দেশ “তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়ের সাথে বিচার করো।” আমার একমাত্র অঙ্গীকার আইনের শাসন সমুন্নত রাখা, কোনো ভয়-ভীতি বা অনুরাগের বশবর্তী না হয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকা এবং আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো সমাজের সাধারণ, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য আদালতকে আস্থার শেষ ঠিকানায় পরিণত করা। সত্য ও ন্যায়ের ঝাণ্ডা আজীবন সমুন্নত রাখাই হবে আমার বিচারক জীবনের পরম ব্রত।
সম্পাদক : শাদমান আল আরবী | নির্বাহী সম্পাদক : তানভীর আল আরবী
ঠিকানা : ঝাউতলা, ১ম কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০। ফোন : ০১৩১৬১৮৬৯৪০, ই-মেইল : info@risingcumilla.com, বিজ্ঞাপন: risingcumillaofficial@gmail.com, নিউজরুম: news.risingcumilla@gmail.com © ২০২৩ রাইজিং কুমিল্লা সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত। | Design & Developed by BDIGITIC