
অধ্যক্ষ মহিউদ্দিন লিটন
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য ৪ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী প্রায় ১৩ লাখ আবেদন করেছে, তার মধ্যে কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেছেন ৯১ হাজার ৪৯৪ জন। এই আবেদন গুলোর মধ্যে ১০ লাখ ৫৬ হাজারের বেশি আবেদন পড়েছে লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্রের জন্য। আর ব্যবহারিক পরীক্ষার খাতার জন্য আবেদন পড়েছে ২ লাখ ৩১ হাজারের বেশি।
এবার ফল পুনর্নিরীক্ষণের ক্ষেত্রে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন বা পুনর্নিরীক্ষণ করা হবে। এত দিন বোর্ডের নিয়মে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ ছিল না। আবেদন করা পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ করে মূলত প্রাপ্ত নম্বরের যোগ-বিয়োগে কোনো ভুল হয়েছে কি না, তা দেখা হতো। গত ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এবার পরীক্ষায় গড় পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৬২.২৫ শতাংশে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী। অথচ ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে সারাদেশে গড় পাসের হার ছিল ৬৮.৪৫ শতাংশ এবং মোট জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন শিক্ষার্থী।
ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট জুনিয়র স্কুল ও হাইস্কুলের সংখ্যা ২১ হাজার ৮৬। এর মধ্যে মাত্র ৬৯১টি স্কুল সরকারি, যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫ লাখ ৭১ হাজার ৬৮১। বেসরকারি স্কুলের সংখ্যা ১৯ হাজার ৭৫৭, যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৮৭ লাখ। বেসরকারি স্কুলগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই এমপিওভুক্ত। তবে ১ হাজার ৭১৭টি হাইস্কুল এবং ১ হাজার ৬২৯টি জুনিয়র হাইস্কুল এখনো এমপিওভুক্ত নয়। এসব স্কুল পরিচালনার পেছনে সরকার কোনো অর্থসহায়তা করে না। কম বেতনে শিক্ষকেরা পাঠদান করেন। আর সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে যে কোন পদে চাকরি পেলেই শিক্ষকতা ছেড়ে চলে যান।
সরকারি ও এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষার্থী প্রতি ব্যয়ের ক্ষেত্রে বেশ তারতম্য আছে। দেশের ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে দেড় কোটির বেশি শিশু। একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে এই বিদ্যালয়গুলোর চরম দুরবস্থা উঠে এসেছে। ১২ শতাংশ স্কুলের মান ভালো, বাকি ৮৮ শতাংশের অবস্থা তেমন ভাল না। শিখনঘাটতি নির্ধারণে খুব একটা উচ্চমান নির্দিষ্ট করা হয়নি, তার মধ্যেও বাংলা, ইংরেজি ও অংকে প্রকট দুর্বলতা রয়েছে।
প্রত্যন্ত গ্রামে একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে যে ৪৮ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এই বিদ্যালয়ে, তাদের মধ্যে ১১ জন বাংলা ঠিকমতো পড়তে পারে না, ইংরেজি বাদই দিলাম।
এই ব্যর্থতা ওই শিশুদের নয়; ব্যর্থতা রাষ্ট্রের, সমাজের, শিক্ষকদের। পক্ষান্তরে কুমিল্লা এবং আরও অনেক শহরে অনেক বেসরকারি স্কুল আছে, যেখানে এই শিখনঘাটতি নেই এবং শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম। স্কুল-শিক্ষাব্যবস্থায় এই যে বৈষম্য বিরাজ করছে, তা এক দিনে সৃষ্টি হয়নি, একবারে শোধরানোও যাবে না। কিন্তু পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই।
মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা সবার আগে দরকার। মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চমানের শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এই মেধা নির্ধারণের ক্ষেত্রে খানিকটা হলেও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে আগে।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন হোক সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ হোক মূল কর্মযজ্ঞ। ষষ্ঠ শ্রেণিকে ইচ্ছা করলে প্রাথমিকে নিয়ে আসা যায়। তবে তা করার আগে অংক ও ইংরেজিতে পারদর্শী অতিরিক্ত অন্তত দুজন করে প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষকেরা যেন পাঠদানে মনোযোগী হন, সে জন্য পরিদর্শনব্যবস্থা আরো জোরদার করা প্রয়োজন।
মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হওয়া উচিত ৮৭ লাখ শিক্ষার্থীর যারা আংশিক বা পুরোপুরি সুবিধাবঞ্চিত, তাদের তুলে আনা। অবশিষ্ট হাই স্কুলগুলোকে এমপিওর আওতায় নিয়ে আসতে হবে। যেগুলোতে শিক্ষার্থী খুব কম, সেগুলোকে প্রয়োজনে একীভূত করা যেতে পারে। আর পর্যায়ক্রমে সব মাধ্যমিক স্কুলকে সরকারীকরণ করা বর্তমান সময়ের দাবী।
যে শিক্ষক অন্য চাকরি পাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় আছেন, তিনি কতটা মনোযোগ দিতে পারবেন পড়ানোর কাজে? শিক্ষকদের বিকল্প জীবিকার চিন্তা থেকে মুক্তি দিতে হবে। প্রয়োজনে অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচন করে আগামী দিনগুলোতে মেগা প্রকল্প হোক শুধু শিক্ষা ।
সরকারের একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। গত অর্থবছরের ৮৭ হাজার কোটি টাকার তুলনায় এই পরিমাণ দেড় গুণের বেশি। আগামী বছরগুলোতে এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছি। কারণ, আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রত্যয় সরকারি পর্যায় থেকেই ব্যক্ত করা হয়েছে।
মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা প্রত্যেক শিশুর অধিকার, আর তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিঃসন্দেহে সরকারের। ইতি মধ্যে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলেছেন, বাংলাদেশ হবে আন্তর্জাতিক শিক্ষা হাব। এ রকম কথা শুনতে খুবই ভালো লাগে। বর্তমানে অবশ্যই এটি একটি স্বপ্ন। তবে বাস্তবে বড় কিছু করতে গেলে স্বপ্ন তো দেখতেই হবে। এ লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ হবে দীর্ঘ এবং কঠিন।
একটা সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীরা পড়তে আসতেন, এখন আমাদের শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়তে যাচ্ছেন। আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আমাদের ছেলেমেয়ে ও অভিভাবকদের আস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে আগে। এ লক্ষ্যে পরিকল্পনা দরকার দীর্ঘ মেয়াদী তবে শুরু করার এখনই সময়।
প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, কুমিল্লা আইডিয়াল কলেজ, বাগিচাগাঁও, কুমিল্লা।
সম্পাদক : শাদমান আল আরবী | নির্বাহী সম্পাদক : তানভীর আল আরবী
ঠিকানা : ঝাউতলা, ১ম কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০। ফোন : ০১৩১৬১৮৬৯৪০, ই-মেইল : [email protected], বিজ্ঞাপন: [email protected], নিউজরুম: [email protected] © ২০২৩ রাইজিং কুমিল্লা সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত। | Design & Developed by BDIGITIC