
মোঃ রায়হানুল বারি রাসেল
বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোতে আশঙ্কাজনকভাবে শিশু নির্যাতনের হার দিন দিন বাড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র আমরা দেখি। কোনো একটি সংবাদ যখন প্রথমবার আসে, তখন আমরা স্তব্ধ হয়ে যাই। দ্বিতীয়বার এলে আমরা ক্ষুব্ধ হই। তৃতীয়বার, চতুর্থবার, পঞ্চমবার আসতে থাকলে একসময় সেই স্তব্ধতা আর ক্ষোভ ম্লান হয়ে একধরনের অভ্যস্ততায় রূপ নেয়। আর ঠিক এই অভ্যস্ততাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
বাংলাদেশে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিশু নির্যাতনের খবর এখন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কোনো না কোনো গণমাধ্যমে উঠে আসছে। কখনো শিকলে বেঁধে নির্যাতনের ভিডিও, কখনো যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, কখনো বা এমন নির্মম ঘটনা যার বিবরণ দিতেও কলম কেঁপে ওঠে। এই ঘটনাগুলোকে আর "বিচ্ছিন্ন" বলে দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই, কারণ পরিসংখ্যান নিজেই বলছে ভিন্ন কথা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী গত বছর মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে কমপক্ষে ৫২টি শিশু, যাদের মধ্যে তিনজন মারা গেছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় অন্তত ২১১টি ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বলে ভিন্ন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
আর এই সংখ্যাগুলো কেবল তা-ই, যা নথিভুক্ত হয়েছে বা গণমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছেছে। বাস্তব চিত্র নিঃসন্দেহে আরও অনেক ভয়াবহ, কারণ লোকলজ্জা, সামাজিক চাপ আর প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতার আড়ালে প্রকৃত সংখ্যার একটি বড় অংশ চিরকাল অন্ধকারেই থেকে যায়।
প্রতিটি শিশুর জীবনই রাষ্ট্রের কাছে অমূল্য হওয়ার কথা, অথচ এই পরিসংখ্যান আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে আমরা বছরের পর বছর ধরে সেই মূল্য দিতে ব্যর্থ হয়ে চলেছি।
সমস্যার গোড়ায় গেলে দেখা যায়, দেশের বহু হেফজখানা ও কওমি মাদ্রাসা কোনো সরকারি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে নেই। কওমি মাদ্রাসাগুলোর সবচেয়ে বড় বোর্ড বেফাকের হিসাব অনুযায়ী শুধু তাদের অধীনেই ২০২৫ সালে মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ২৯ হাজার। অথচ এর বাইরেও আরও অন্তত পাঁচটি পৃথক বোর্ড এবং অসংখ্য অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়ে গেছে, যাদের কোনো কেন্দ্রীয় জবাবদিহিতা নেই।
এই তদারকিহীনতার সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো যৌন নির্যাতনে অভিযুক্ত কোনো শিক্ষক জামিনে বেরিয়ে এসে অনায়াসে আবার শিক্ষকতায় ফিরে যেতে পারেন। কোনো কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ নেই যেখানে তার অতীত রেকর্ড যাচাই করা যায়, কোনো নিষেধাজ্ঞাও কার্যকর হয় না।
এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে, শিক্ষক হওয়ার জন্য শুধু হিফজ সম্পন্ন করাই কি যথেষ্ট? একজন শিক্ষকের ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি শিশু মনস্তত্ত্ব, শিশু সুরক্ষা নীতিমালা এবং শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কেও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। অথচ বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই হিফজ সম্পন্ন করার পরপরই কেউ একটি হেফজখানা খুলে শিক্ষকতা শুরু করতে পারেন।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে যেখানে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ, সনদ ও নিবন্ধন পরীক্ষা বাধ্যতামূলক, সেখানে প্রান্তিক পর্যায়ের বহু মাদ্রাসায় শিক্ষক হওয়ার একমাত্র মাপকাঠি যেন কোরআন মুখস্থ থাকা। এই ফাঁক গলেই জালিম প্রকৃতির মানুষেরা "শিক্ষক" পরিচয়ে ঢুকে পড়ার সুযোগ পান।
কওমি ও হেফজ মাদ্রাসা মিলিয়ে প্রায় ১৩ হাজার প্রতিষ্ঠানে আজও কোনো সুনির্দিষ্ট বেতনকাঠামো নেই। শহরের বড় মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক যেখানে মাসে ৩০ থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পান, সেখানে গ্রামের একজন মাদ্রাসা-প্রধানের বেতন সাকুল্যে ছয় হাজার টাকা পর্যন্তও নেমে আসে।
এই বৈষম্যের কারণে অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকরা প্রান্তিক পর্যায়ের মসজিদ-মাদ্রাসা-এতিমখানায় চাকরি নিতে আগ্রহী হন না। ফলে যে কেউ, যেকোনো যোগ্যতায় এসব প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়ার সুযোগ পেয়ে যান। প্রশিক্ষণহীনতা আর অর্থনৈতিক অবহেলা, এই দুই মিলে তৈরি হয় এমন এক পরিবেশ, যেখানে জবাবদিহিতার কোনো জায়গা নেই।
দেশের অধিকাংশ হেফজ ও কওমি মাদ্রাসা সম্পূর্ণ আবাসিক ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। শিশুরা দিনের চব্বিশ ঘণ্টাই শিক্ষকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, বাইরের কারো নজরদারির বাইরে। এই আবাসিক কাঠামো অন্য যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় শিশুকে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে ফেলে দেয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ধর্মীয় কর্তৃত্বকে প্রশ্ন না করার একটি প্রচলিত সংস্কৃতি। শিক্ষকের বিরুদ্ধে কথা বলা মানেই যেন ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা, এমন একটি ভুল ধারণা সমাজে বদ্ধমূল হয়ে আছে। অথচ ইসলাম নিজেই শিশুর প্রতি সর্বোচ্চ স্নেহ ও সুরক্ষার শিক্ষা দেয়; কোনো ব্যক্তির অপরাধকে ধর্মের আড়ালে ঢাকার সুযোগ নেই। তবু এই নীরবতার সংস্কৃতির কারণে বহু অভিযোগ প্রথমেই থমকে যায়।
নির্যাতনের শিকার হওয়া শিশুর পরিবার প্রায়ই লোকলজ্জার ভয়ে বিষয়টি চেপে যায় বা স্থানীয়ভাবে "আপস" করে ফেলে; মামলা পর্যন্ত গড়ায় না। ছেলেশিশুদের ক্ষেত্রে এই নীরবতা আরও গভীর। সমাজে এখনো একথা বলাই কঠিন যে একটি ছেলেশিশুও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারে। ফলে তাদের কষ্ট প্রায় পুরোপুরি অদৃশ্য থেকে যায়।
এর ফলে প্রকৃত ঘটনার একটি বড় অংশ কখনোই থানা, আদালত বা গণমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছায় না। মাদ্রাসাভিত্তিক শিশু নির্যাতনের কোনো নিয়মিত, কেন্দ্রীয় ও বাৎসরিক পরিসংখ্যান রাখার মতো সুনির্দিষ্ট সরকারি সংস্থা নেই। ফলে সমস্যার প্রকৃত ব্যাপ্তি সম্পর্কে আমাদের ধারণাই অস্পষ্ট থেকে যায়, আর যা পরিমাপ করা যায় না, তা সমাধানও করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই অনিয়ন্ত্রিত প্রান্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছে দেশের সুশৃঙ্খল, দায়িত্বশীল মূলধারার মাদ্রাসাগুলো। একটি ঘটনা ভাইরাল হলে মানুষের মনে গোটা মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কেই সংশয় তৈরি হয়, যা প্রকৃতপক্ষে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অবিচার।
গণমাধ্যমে এসব নির্যাতনের চিত্র দেখে সচেতন অভিভাবকদের একটি অংশ এখন নিজেদের সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। কিছু ব্যক্তির অপরাধের দায় এখন পুরো মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর পড়ছে। দ্রুত কার্যকর সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি মানুষের আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।
সরকার ইতিমধ্যে কওমি মাদ্রাসাকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং এ লক্ষ্যে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এই উদ্যোগকে দ্রুত বাস্তবায়নে রূপ দেওয়া দরকার, নিম্নলিখিত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে:
১. যত্রতত্র মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা বন্ধ করে সব ধরনের মাদ্রাসাকে (কওমি, হেফজ, আলিয়া নির্বিশেষে) একটি কেন্দ্রীয় নিবন্ধন ও নজরদারি কাঠামোর আওতায় আনা।
২. শিক্ষক নিয়োগের ন্যূনতম মাপকাঠি নির্ধারণ করতে হবে। শুধু হাফেজ হওয়া নয়, বরং শিশু সুরক্ষা ও শিক্ষাদান পদ্ধতির প্রাথমিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৩. অভিযুক্ত শিক্ষকদের একটি কেন্দ্রীয় তালিকা তৈরি করতে হবে, যাতে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিনি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানেও পুনরায় নিয়োগ পেতে না পারেন।
৪. মসজিদ-মাদ্রাসা-এতিমখানার শিক্ষকদের জন্য একটি ন্যূনতম বেতনকাঠামো নির্ধারণ করতে হবে, যাতে যোগ্য ও অভিজ্ঞ মানুষ এই পেশায় আসতে আগ্রহী হন।
৫. নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শনের ব্যবস্থা চালু করে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৬. মাদ্রাসাভিত্তিক শিশু নির্যাতনের একটি কেন্দ্রীয়, স্বচ্ছ ও বাৎসরিক পরিসংখ্যান-ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে সমস্যার প্রকৃত ব্যাপ্তি সম্পর্কে নীতিনির্ধারকদের কাছে স্পষ্ট চিত্র থাকে।
৭. অভিভাবক ও স্থানীয় সমাজে সচেতনতা তৈরি করতে হবে, যাতে লোকলজ্জার ভয়ে কোনো ঘটনা আপসে চাপা না পড়ে এবং ছেলে বা মেয়ে উভয় শিশুর অভিযোগই সমান গুরুত্ব পায়।
মাদ্রাসাশিক্ষা আমাদের সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লক্ষ লক্ষ পরিবারের ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং প্রজন্ম পরম্পরায় বয়ে চলা এক গভীর আস্থা।
ঠিক এই কারণেই এই ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব। যতদিন আমরা প্রতিটি ঘটনাকে "বিচ্ছিন্ন" বলে সান্ত্বনা খুঁজব, ততদিন সংস্কারের প্রকৃত তাগিদ তৈরি হবে না। আর প্রতিটি বিলম্বিত সংস্কারের মূল্য শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো শিশুর জীবন দিয়েই শোধ করতে হতে পারে।
রাষ্ট্র, প্রশাসন, মাদ্রাসা বোর্ড, অভিভাবক ও সচেতন সমাজ সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ একটি শিশুর নিরাপত্তা কোনো একক পক্ষের দায় নয়; এটি আমাদের সামষ্টিক দায়বদ্ধতার বিষয়। একটি শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে বড় কোনো ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি বড় হতে পারে না। তাই শিশুকে সুরক্ষিত রাখাই হতে হবে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারলেই আমরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ পাবো।
তথ্যসূত্র
"মাদ্রাসায় যৌন সহিংসতা, আমাদের নীরবতার মূল্য", banglastream.net, জুন ৩, ২০২৬।
"মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতন: কওমি বোর্ডের দ্বিমুখী নীতি", bangla.tob.news, মে ২৬, ২০২৬।
"মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতন, অতঃপর", netra.news, জুন ১১, ২০২৬।
কওমি ও হেফজ মাদ্রাসায় বেতন বৈষম্য (শহরে ৩০-৯০ হাজার টাকা বনাম গ্রামে ৬ হাজার টাকা)। "কওমি শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য, শীর্ষে হাটহাজারী মাদ্রাসা", বাংলা ট্রিবিউন, ২৬ জানুয়ারি ২০১৮।
লেখক: মোঃ রায়হানুল বারি রাসেল
শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
সম্পাদকীয় পর্ষদ সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
মোবাইল: ০১৮৯১৬৫১৮১০
সম্পাদক : শাদমান আল আরবী | নির্বাহী সম্পাদক : তানভীর আল আরবী
ঠিকানা : ঝাউতলা, ১ম কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০। ফোন : ০১৩১৬১৮৬৯৪০, ই-মেইল : [email protected], বিজ্ঞাপন: [email protected], নিউজরুম: [email protected] © ২০২৩ রাইজিং কুমিল্লা সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত। | Design & Developed by BDIGITIC