রবিবার ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬

ব্রাশ দিয়ে পিঠ চুলকায় গরু! অস্ট্রিয়ার ভেরোনিকা বদলে দিল গবাদিপশুর বুদ্ধিমত্তার ধারণা

লাইফস্টাইল ডেস্ক

Rising Cumilla - Cows scratch their backs with a brush! Austrian Veronica changes the idea of ​​cattle intelligence
অস্ট্রিয়ার বুদ্ধিমান গরু ভেরোনিকা নিজের মুখে ব্রাশ তুলে নিয়ে পিঠ চুলকাচ্ছে/ছবি: সিএনএন

একটি গরু কীভাবে নিজের পিঠের চুলকানি চুলকায়? অস্ট্রিয়ার ভেরোনিকা নামের এক গরু এমন একটি সমাধান বের করেছে, যা গবাদিপশু সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিতে পারে।

গত এক দশক ধরে ভেরোনিকার মালিক লক্ষ্য করছেন, গরুটি মাঝে মাঝেই মুখে করে লাঠি তুলে নেয় এবং সেই লাঠির এক প্রান্ত নিজের শরীরের এমন সব জায়গায় পৌঁছে দেয়, যেখানে সে স্বাভাবিকভাবে পৌঁছাতে পারে না। সম্প্রতি ভিয়েনার ইউনিভার্সিটি অব ভেটেরিনারি মেডিসিনের একদল প্রাণী আচরণ–বিশেষজ্ঞ ভেরোনিকার এই কাজের ভিডিও দেখেন। তখনই তারা বুঝতে পারেন, লাঠি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ভেরোনিকার আচরণ সত্যিই ব্যতিক্রমী।

ভেরোনিকার এই উদ্ভাবনী আচরণ নিয়ে একটি নতুন গবেষণায় প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এটি পোষা গরুর মধ্যে প্রথমবারের মতো ‘টুল ব্যবহার’-এর প্রামাণ্য বর্ণনা। সম্প্রতি গবেষণাটি বৈজ্ঞানিক সাময়িকী কারেন্ট বায়োলজি-তে প্রকাশিত হয়।

“এটি আমাদের জানায় যে গরুর মধ্যেও টুল ব্যবহার উদ্ভাবনের সক্ষমতা রয়েছে, আর আমরা হাজার হাজার বছর ধরে এই সত্যটি উপেক্ষা করে এসেছি,” ইমেইলে বলেন গবেষণার প্রধান লেখক আন্তোনিও জে. ওসুনা-মাস্কারো, যিনি ভিয়েনার ইউনিভার্সিটি অব ভেটেরিনারি মেডিসিনে পোস্টডক্টরাল গবেষক। “বিশ্বজুড়ে প্রায় দেড় বিলিয়ন গরু রয়েছে, আর মানুষ অন্তত ১০ হাজার বছর ধরে তাদের সঙ্গে সহাবস্থান করছে। এতদিন পর এসে আমরা এই বিষয়টি আবিষ্কার করছি—এটা সত্যিই বিস্ময়কর।”

ওসুনা-মাস্কারোর মতে, এই গবেষণা ভবিষ্যতে আরও বেশি গরুর মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণের পথ খুলে দেবে এবং এটি প্রমাণ করতে পারে যে খামারের পশুদের জ্ঞানগত সক্ষমতা আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি।

সুইস ব্রাউন জাতের ভেরোনিকা অস্ট্রিয়ার ছোট শহর ন্যোৎস ইম গাইলতালে একটি খামারে থাকে। সবুজ চারণভূমি, পথচারীদের শুভেচ্ছা—একটি পোষা গরুর জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সবই সেখানে রয়েছে।

গবেষণার লেখকেরা যখন প্রথম ভেরোনিকার লাঠি দিয়ে নিজেকে চুলকানোর ভিডিও দেখেন, তখনই তারা বুঝতে পারেন, এই আচরণটি কোনোভাবেই দুর্ঘটনাবশত নয়; এটি ছিল সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত, বলেন ওসুনা-মাস্কারো।

ভেরোনিকার টুল ব্যবহারের সক্ষমতা কতটা বিস্তৃত, তা যাচাই করতে গবেষকেরা একাধিক নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা চালান। তারা বিভিন্ন অবস্থানে একটি ডেক ব্রাশ গরুটির সামনে রাখেন। প্রতিবার ভেরোনিকা তার লম্বা জিহ্বা ব্যবহার করে ব্রাশটি তোলে। গবেষকেরা লক্ষ্য করেন, সে কোন প্রান্তটি বেছে নিচ্ছে এবং শরীরের কোন অংশে চুলকানি দিচ্ছে।

গবেষণায় দেখা যায়, ভেরোনিকা শুধু প্রকৃত অর্থেই টুল ব্যবহার করছে না—যেখানে কোনো বস্তু নির্দিষ্ট কার্যকরী কাজে ব্যবহৃত হয়ে দেহের স্বাভাবিক সীমা বাড়িয়ে দেয়—বরং সে কীভাবে সেই টুল ব্যবহার করবে, সে বিষয়েও তার স্পষ্ট পছন্দ রয়েছে। ব্রাশের যে পাশে ব্রিসল (ঝাড়ুর মতো অংশ) ছিল, সেটি সে ব্যবহার করত শরীরের উপরের দিকের মোটা চামড়ার অংশে ঘষার জন্য। আর নিচের দিকের তুলনামূলক নরম ও সংবেদনশীল অংশে, যেমন তার ওলান, সেখানে ব্যবহার করত মসৃণ হাতল দিকটি।

“এটি অত্যন্ত বিস্ময়কর,” বলেন ওসুনা-মাস্কারো। “কারণ বহুমুখী টুল ব্যবহারের আরেকটি শক্ত উদাহরণ আমরা শুধু কঙ্গো বেসিনের শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেই জানি। তারা কখনো কখনো একটি লাঠির এক প্রান্ত দিয়ে উইঢিবিতে গর্ত করে এবং অন্য প্রান্ত দিয়ে সেখান থেকে উইপোকা ধরে। ভেরোনিকার ক্ষেত্রে স্থানিক সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে সহজ। তবুও, একটি গরুর মধ্যে এমন সক্ষমতা পাওয়া সত্যিই আশ্চর্যজনক।”

শিম্পাঞ্জিদের হাতে বিপরীতমুখী বুড়ো আঙুল থাকলেও, মুখ ব্যবহার করে ভেরোনিকা যে মাত্রার নিয়ন্ত্রণ দেখিয়েছে, তা গবেষকদের অবাক করেছে। কোন দিকটি ব্যবহার করবে, শরীরের কোন অংশে চুলকাবে এবং কোন কোণে নড়াচড়া দরকার—সব কিছুর ওপর ভিত্তি করে সে নিজের ধরন বদলাত। শরীরের ওপরের অংশে সে জোরালো ঘষা দিত, আর লাঠির দিক ব্যবহার করে নিচের অংশে দিত হালকা ও নিয়ন্ত্রিত চাপ।

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের বোল্ডারের ইকোলজি ও বিবর্তনমূলক জীববিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মার্ক বেকফ, যিনি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তিনিও মনে করেন ভেরোনিকার ডেক ব্রাশ ব্যবহার নিঃসন্দেহে টুল ব্যবহারের উদাহরণ।

“সে ব্রাশটি তৈরি করেনি ঠিকই, কিন্তু সে স্পষ্টভাবে শিখেছে যে এটি চুলকানি কমাতে কাজে লাগে এবং এতে তার ভালো লাগে,” ইমেইলে বলেন বেকফ। “যেহেতু সে এত দক্ষতার সঙ্গে ব্রাশটি ব্যবহার করছে, আমি নিশ্চিত অন্য অনেক গরুরও এমন বুদ্ধিমত্তা রয়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “গরু ও অন্যান্য উচ্চ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন, অনুভূতিপ্রবণ প্রাণীদের প্রায়ই বোকার মতো মনে করা হয় এবং তাদের আবেগহীন বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু বিস্তারিত গবেষণা দেখিয়েছে, তারা সম্পূর্ণ সংবেদনশীল সত্তা, যাদের মস্তিষ্ক সক্রিয় এবং আবেগজগত গভীর ও সমৃদ্ধ।”

১৯৬০ সালে বিশ্বখ্যাত প্রাইমাটোলজিস্ট জেন গুডল যখন শিম্পাঞ্জিদের টুল তৈরি ও ব্যবহার করতে দেখান, তখন মানুষের মধ্যেই এই বৈশিষ্ট্য সীমাবদ্ধ—এই ধারণা ভেঙে পড়ে এবং শিম্পাঞ্জিদের সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি চিরতরে বদলে যায়।

১৯৭০-এর দশকে পাখিবিজ্ঞানী আইরিন পেপারবার্গ প্রমাণ করেন যে ছোট মস্তিষ্ক হলেও পাখিরা জটিল চিন্তাশক্তি প্রদর্শন করতে পারে। তিনি আফ্রিকান গ্রে তোতাপাখি নিয়ে একাধিক গবেষণা প্রকাশ করেন, যেখানে দেখা যায়, তারা শব্দভান্ডার বোঝা বা বস্তু গণনার মতো দক্ষতায় মানবশিশুর সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

“আজ আমরা জানি, করভিড ও তোতাপাখিরা কিছু কাজে বড় এপদের সমতুল্য হতে পারে,” বলেন ওসুনা-মাস্কারো। “কয়েক বছর আগেও এটা কল্পনাতীত ছিল। ভেরোনিকা তারই একটি উদাহরণ। আমরা যেসব প্রাণীকে কাজে লাগাই, তাদের জ্ঞানগত সক্ষমতা নিয়ে আমাদের এখনও গভীর পক্ষপাত রয়েছে, আর ভেরোনিকা আমাদের সেই ভুলটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।”

ভেরোনিকার পরিবেশ—যেখানে মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে এবং চারপাশে রয়েছে সমৃদ্ধ প্রকৃতি—এই আচরণ গড়ে ওঠার জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে গবেষকদের মতে, ভেরোনিকা কোনো ‘গরুদের আইনস্টাইন’ নয়। ওসুনা-মাস্কারোর ধারণা, আরও অনেক গরু, ষাঁড় ও খামারের প্রাণীর মধ্যেই এই সক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু তা নজরে আসেনি।

গবেষকেরা ভবিষ্যতে ভেরোনিকার সক্ষমতা নিয়ে আরও গবেষণা করতে চান। একই সঙ্গে তারা অনুরোধ জানিয়েছেন, কেউ যদি নিজের চোখে কোনো খামারের প্রাণীকে টুল ব্যবহার করতে দেখেন, তবে ইমেইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

“দূরবর্তী দ্বীপের বিরল প্রাণীদের টুল ব্যবহার সম্পর্কে আমরা যতটা জানি, আমাদের সঙ্গে বসবাসকারী গরুদের সম্পর্কে তার চেয়েও কম জানি,” বলেন ওসুনা-মাস্কারো। “তবে এখন আমরা ধীরে ধীরে তাদের পর্যবেক্ষণের মতো সংবেদনশীল হয়ে উঠছি এবং অন্তত কিছু প্রাণীকে এমন জীবন দেওয়ার চেষ্টা করছি, যেখানে তারা খেলতে পারে, বস্তু নিয়ে কাজ করতে পারে এবং নিজেরাই সেগুলো ব্যবহার করতে শিখতে পারে।”

সূত্র: সিএনএন 

আরও পড়ুন