
দেশে সম্প্রতি হাম বা মিজেলসের সংক্রমণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন হাসপাতালেই বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা। রাজশাহী অঞ্চলে এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা গেলেও ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহসহ দেশের আরও কয়েকটি জেলায় রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে অনেক শিশুর মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে, যা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, পাবনাসহ কয়েকটি জেলার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতি বছরই শিশুরা হামে আক্রান্ত হয়, তবে এ বছর সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মাহমুদে কায়নাত গণমাধ্যমকে জানান, রোববার দুপুর পর্যন্ত নতুন করে ১৪–১৫ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আক্রান্তদের বেশিরভাগই এক থেকে কয়েক বছর বয়সী শিশু।
কুমিল্লায় হামের উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত ৫২ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে চারজনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে এবং আরেক শিশুর মধ্যে রুবেলা শনাক্ত হয়েছে।
জেলার সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর বাশার গণমাধ্যমকে জানান, বর্তমানে চারটি শিশু একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সন্দেহভাজন হামের চিকিৎসা নিচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচ শিশু নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। তবে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে অনেক রোগীই বাড়ি ফিরছে এবং এখন পর্যন্ত জেলায় কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. জাভেদ আহমেদ জানান, বর্তমানে সেখানে ১৩ শিশু ভর্তি রয়েছে। রোগীদের জন্য দুটি আইসোলেশন ইউনিট চালু করা হয়েছে, যেখানে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের জন্য ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য থাকা আইসোলেশন ইউনিট খালি রয়েছে।
হঠাৎ কেন হামের প্রাদুর্ভাব
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, শিশুদের মায়ের বুকের দুধ ঠিকমতো না খাওয়ানো, প্রয়োজনীয় কৃমিনাশক ওষুধ না খাওয়া এবং অপুষ্টি—এসব কারণেই নতুন করে হামের প্রকোপ বাড়ছে।
এছাড়া হামের টিকার মান কিংবা দীর্ঘদিন ধরে টিকা প্রয়োগের ফলে ভাইরাসের ধরনে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) থেকে বাদ পড়ে যাওয়ায় তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং অপুষ্টির কারণেও ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ ডোজ নেওয়ার ফলে একটি বড় জনগোষ্ঠী ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যা প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ।
শিশুকে হাম থেকে বাঁচাতে যা করবেন
শিশুকে হাম থেকে সুরক্ষা দিতে নির্ধারিত সময়ে এমএমআর (মিজেলস, মাম্পস ও রুবেলা) টিকা দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে—এটিই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
এর পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখতে হবে এবং হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। জ্বরের সঙ্গে শরীরে র্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
হামের টিকা কেন জরুরি
হাম কেবল সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ির রোগ নয়। এতে প্রবল জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং আলো সহ্য করতে না পারার মতো উপসর্গ দেখা যায়। এটি অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ।
হামে আক্রান্ত হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে শিশু নিউমোনিয়া ও মারাত্মক ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। এর ফলে অপুষ্টিও দেখা দিতে পারে এবং শিশুর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
সরকারি ইপিআই কর্মসূচির পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও এমএমআর টিকা পাওয়া যায়, যা হাম ছাড়াও মাম্পস ও রুবেলা থেকে সুরক্ষা দেয়।
শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত দুই ডোজ টিকা দেওয়া হয়—প্রথম ডোজ ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে। যারা শৈশবে টিকা নেয়নি, তারা অন্তত ২৮ দিনের ব্যবধানে দুই ডোজ নিতে পারে।









