প্রিন্ট এর তারিখঃ মার্চ ১৩, ২০২৬, ৩:৪৩ পি.এম ||
প্রকাশের তারিখঃ মার্চ ১৩, ২০২৬, ১:১৭ পিএম
২০০৮ সাল থেকে প্রতি বছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুক্রবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে বিশ্ব ঘুম দিবস। সেই ধারাবাহিকতায় এ বছর দিবসটি পালিত হচ্ছে আজ শুক্রবার।
বিশ্ব ঘুম দিবস মূলত ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব স্লিপ মেডিসিন–এর অর্থায়নে অনুষ্ঠিত একটি বার্ষিক সচেতনতামূলক উদ্যোগ। এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— “ভালো ঘুমাও, ভালোভাবে বাঁচো।”
পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের অন্তত ১০০ মিলিয়ন মানুষের পর্যাপ্ত ঘুম হয় না। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ২২ মিলিয়ন মানুষ নিদ্রাহীনতায় ভোগেন।
আরও এক গবেষণায় দেখা যায়, ছুটির দিনে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দুই ঘণ্টা বেশি ঘুমালে দেহঘড়ি (বডি ক্লক) প্রায় ৪৫ মিনিট বিলম্বিত হয়। এর ফলে ছুটির দিন শেষে রাতে ঘুম কম হয় এবং পরের দিন কাজে ক্লান্তি ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দেয়।
এই কারণে গবেষকেরা সপ্তাহের প্রতিটি রাতেই কমপক্ষে আট ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
ভিটামিন ডি ও সূর্যালোকের গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি নিশ্চিত করতে ছুটির দিনে অন্তত ৬ থেকে ৮ মিনিট সূর্যের আলোতে থাকা উপকারী। সূর্যালোক দেহঘড়িকে ঠিক রাখতে সহায়তা করে।
ভিটামিন ডি–এর ঘাটতির কারণে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সার ও অস্টিওপোরোসিস হতে পারে।
অস্টিওপোরোসিস এমন একটি রোগ, যাতে মানুষের হাড়ের ঘনত্ব ও ওজন কমে যায়। হাড়ের আকার বড় হলেও এর মধ্যে অসংখ্য ছিদ্র তৈরি হয় এবং হাড় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
ভালো ঘুম মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
গবেষণায় ঘুমের নানা ইতিবাচক দিক তুলে ধরা হয়েছে। নিয়মিত ভালো ঘুম ভবিষ্যৎ জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের বেয়লর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লিপ নিউরোসায়েন্স অ্যান্ড কগনিশন ল্যাবরেটরি পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবয়সে ভালো ঘুম ভবিষ্যতের মানসিক প্রশান্তির জন্য বড় পুঁজি হিসেবে কাজ করে। এখানে মধ্যবয়স বলতে ত্রিশোর্ধ্ব সময়কে বোঝানো হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, ঘুমের সঙ্গে স্মৃতিশক্তির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণত বার্ধক্যে স্মৃতিশক্তি কমে যায় এবং মানসিক দুর্বলতা তৈরি হয়। ফলে অনেকেরই অনিদ্রা দেখা দেয়। তবে মধ্যবয়সে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম ভবিষ্যতে এসব সমস্যার ঝুঁকি কমাতে পারে।
ঘুমের উপকারিতা
চরম ব্যস্ততার এই সময়ে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই ঘুমকে অবহেলা করছেন। ফলে শরীর ও মনে নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। অথচ পর্যাপ্ত ঘুমের রয়েছে অনেক উপকারিতা—
- পর্যাপ্ত ঘুম হৃদ্পিণ্ড সুস্থ রাখে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে
- স্মৃতিশক্তি বাড়ায় এবং ভুলে যাওয়ার প্রবণতা কমায়
- অতিরিক্ত বা খুব কম ঘুম আয়ুর ওপর প্রভাব ফেলে
২০১০ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী মৃত নারীদের মধ্যে অধিকাংশই কম বা বেশি ঘুমানোর কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন।
কম ঘুমের ফলে যেসব সমস্যা বাড়ে
গবেষণা বলছে, যারা রাতে ৬ ঘণ্টা বা তার কম ঘুমান, তাদের মধ্যে হার্টের রোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস ও অকাল বার্ধক্যের ঝুঁকি বেশি থাকে। কারণ তাদের রক্তে ইনফ্লামেটরি প্রোটিনের পরিমাণ বেড়ে যায়।
সৃজনশীলতা বাড়ায় ঘুম
হার্ভার্ড ও বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, ঘুমের সময় মানুষের স্মৃতি ও কল্পনার নানা উপাদান মস্তিষ্কে সক্রিয় থাকে। ফলে ভালো ঘুম সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক। বিশেষ করে ছবি আঁকার মতো কাজে এর প্রভাব বেশি দেখা যায়।
খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সেও ঘুম গুরুত্বপূর্ণ
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কলেজের ফুটবল খেলোয়াড়দের মধ্যে যারা রাতে ১০ ঘণ্টা ঘুমান, ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ পরে তাদের স্ট্যামিনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
শিক্ষার্থীদের ফলাফলেও প্রভাব
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যারা পরীক্ষায় ভালো ফল করেন, তারা সাধারণত অন্যদের তুলনায় বেশি ঘুমান। অন্যদিকে কম ঘুমানো শিক্ষার্থীদের ফলাফল তুলনামূলক খারাপ হয়। এমনকি শিশুদের ক্ষেত্রে ঘুম কম হলে অমনোযোগী হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
ওজন কমাতেও সহায়ক ঘুম
যারা ডায়েট চার্ট মেনে চলেন এবং পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুমান, তাদের ওজন অন্যদের তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেশি কমে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মানসিক চাপ কমায়
স্ট্রেস কমাতে ঘুম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পর্যাপ্ত ঘুম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে, হতাশা কমায় এবং মানসিক উদ্বেগ হ্রাস করে। ঘুমের ঘাটতি থাকলে হতাশা ও উদ্বেগ বেড়ে যেতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ঘুমের টিপস
- ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন
- দিনে ঘুমালে তা ৪৫ মিনিটের বেশি নয়
- ঘুমের অন্তত ৪ ঘণ্টা আগে মদ্যপান বন্ধ করুন
- ঘুমানোর আগে ধূমপান করবেন না
- ঘুমানোর আগে ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন
- অত্যধিক মসলাদার খাবার খেয়ে ঘুমাতে যাবেন না
- আরামদায়ক বিছানা বেছে নিন।
শিশুদের জন্য ঘুমের টিপস
- প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে
- রাত ৯টার মধ্যে ঘুমানো সবচেয়ে ভালো
- দিনে মাঝে মাঝে অল্প বিশ্রাম নেওয়ার অভ্যাস করতে হবে
- ঘুমানোর জায়গা হবে অন্ধকার, পরিচ্ছন্ন ও আরামদায়ক তাপমাত্রার
- শিশুকে একা ঘুমানোর অভ্যাস করাতে হবে
- ঘুমানোর অন্তত ২ ঘণ্টা আগে ফোন, কম্পিউটার গেম ও টিভি বন্ধ করতে হবে।
সূত্র: এই সময়, ইন্টারনেট