
ভারত ছাড়িয়ে এখন বাংলাদেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ইমরান হাশমি ও ইয়ামি গৌতম অভিনীত চলচ্চিত্র ‘হক’। ছবিটি গত ৭ নভেম্বর ভারতসহ কয়েকটি দেশে মুক্তি পায়। তবে মুক্তির আগেই সিনেমাটি পড়ে যায় আইনি জটিলতায়।
শাহ বানু বেগমের উত্তরাধিকারীরা সিনেমাটির মুক্তির ওপর স্থগিতাদেশ চেয়ে ইন্দোর হাইকোর্টে রিট করেন। তাদের অভিযোগ, সিনেমাটি মুসলিম সম্প্রদায়ের অনুভূতিতে আঘাত করেছে এবং শরিয়া আইনকে অবমাননাকর ও নারীবিরোধীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে তারা দাবি করেন, শাহ বানু বেগমের জীবন বা গল্প চিত্রায়ণের ক্ষেত্রে নির্মাতারা কোনো আইনি অনুমোদন কিংবা উত্তরাধিকারীদের সম্মতি নেননি।
তবে ৪ নভেম্বর বিষয়টি স্পষ্ট হয়। বিতর্কিত সিনেমাটি সেন্সরে দেখার পর বিচারকরা ছবিটিকে ‘আনকাট ভার্সনেই মুক্তি দেওয়ার অনুমতি’ দেন।
যদিও ছবিটি নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই মুক্তি পেয়েছে, তবুও এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর মূল কারণ, নেটফ্লিক্সে সম্প্রতি সিনেমাটি মুক্তি পাওয়া। ফলে ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন বাংলাদেশের দর্শকরাও সহজেই ছবিটি দেখতে পারছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক।
চলচ্চিত্রে ইয়ামি গৌতম অভিনয় করেছেন সাজিয়া বানু চরিত্রে। তার স্বামী আব্বাস খান চরিত্রে দেখা গেছে ইমরান হাশমিকে। বিয়ের প্রায় ৯ বছর পর, যখন তাদের সংসারে তিন সন্তান, তখন পাকিস্তান গিয়ে আব্বাস খান আরেকটি বিয়ে করে দেশে ফেরেন। দ্বিতীয় স্ত্রী হলেন সেই নারী, যার সঙ্গে একসময় আব্বাস খানের প্রেম ছিল।
দ্বিতীয় বিয়ে করে আনার পর সাজিয়া বানুকে যথাযথ সম্মান না দেওয়ায় তিনি বাবার বাড়ি চলে যান। সে সময় আব্বাস খান তিন সন্তানের ভরণপোষণের জন্য মাসে ৪২০ রুপি করে পাঠালেও একপর্যায়ে তা বন্ধ করে দেন। বাধ্য হয়ে সাজিয়া বানু আইনের দ্বারস্থ হন।
তৎকালীন প্রেক্ষাপটে একজন মুসলিম নারীর জন্য আইনের পথে যাওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। তবে এই লড়াইয়ে তার পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান তার বাবা।
মুসলিম ল বোর্ড থেকে কোনো প্রতিকার না পেয়ে সাজিয়া বানু আদালতে যান। কিন্তু আদালত প্রথমে তাকে আবার মুসলিম ল বোর্ডে ফিরে যেতে বলেন। সেখানেও তিনি কোনো ন্যায়বিচার পাননি; বরং সাজিয়া ও তার বাবাকে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও চাপের মুখে পড়তে হয়।
অবশেষে সাজিয়া বানু এই মামলা সেশন কোর্ট, জজ কোর্ট হয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত নিয়ে যান। ছবির প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে এই আদালতকেন্দ্রিক লড়াই। কারণ, তার প্রতিপক্ষ আব্বাস খান নিজেই ছিলেন একজন প্রভাবশালী আইনজীবী।
সিনেমাটির সবচেয়ে বেশি আলোচিত দিক হলো এর সংলাপ। এক জায়গায় আব্বাস খান বলেন, “আমি সওয়াবের জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করেছি।”
এর জবাবে সাজিয়া বানু বলেন— “আপনি সওয়াবের জন্য বিয়ে করেছেন? সওয়াবের জন্য তো জাকাত দেওয়া উচিত, রোজা রাখা উচিত, হজ করা উচিত। আপনি বিয়ে বিয়ে করে সওয়াব অর্জন করতে চাইছেন? আপনাকে তো আমি ঠেলে নামাজেই পাঠাতে পারি না।”
আদালতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংলাপে সাজিয়া বানু বলেন— “আমরা শুধু মুসলিম নারী নই, আমরা ভারতের মুসলিম নারী। এই মাটিতেই বড় হয়েছি। তাই আইন যেন আমাদেরও সেই চোখে দেখে, যেভাবে অন্য ভারতীয়দের দেখে।”
সাজিয়া বানুর এই ন্যায়ের লড়াই, আত্মসম্মান আর সাহসী অবস্থান দর্শকদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করছে। নারীর অধিকার, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও রাষ্ট্রীয় আইনের সংঘাত—সব মিলিয়ে ছবিটি দর্শকদের ভাবাচ্ছে। তাই সিনেমাটি দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করতে পিছপা হচ্ছেন না অনেকেই।










