বৃহস্পতিবার ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ফুলের প্রতি ভালোবাসায় ব্যবসা, প্লাস্টিক ফুলে শঙ্কিত লিটন

সঞ্জয় শীল,নবীনগর,ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

Rising Cumilla - Liton is worried about plastic flowers, but his love for flowers is a business
ফুল ব্যবসায়ী মো. লিটন সরকার / ছবি: প্রতিনিধি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর পৌর এলাকার নারায়ণপুর ৬ নং ওয়ার্ডের প্রয়াত মো. আমির আলী সরকারের ছেলে মো. লিটন সরকার, যিনি সকলের কাছে পরিচিত ফুল লিটন নামে। বিয়ে বাড়ি, পূজা-পার্বণ, জাতীয় দিবসে ফুলের সাঁজ ও তোড়ার ইন্টেরিয়র ডিজাইন ও আউটডোর ডিজাইনের জন্য ডাক পড়ে তার।

আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে যুবক লিটন ঢাকার শাহবাগে ফুলের ব্যবসা দেখে উদ্যোগী হন ফুলকে ভালোবেসে ফুলের ব্যবসায়ী হওয়ার জন্য। যখন স্থানিয়দের মাঝে প্রবাসে যাওয়ার হিড়িক ছিলো তখন তাকে ফুলের ব্যবসা করতে গিয়ে শুনতে হয়েছিলো অনেকের কুটুকথা।

এখানকার স্থানিয়রা এক সময় বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রিয়সহ যে কোন অনুষ্ঠানের ফুলের জন্য ছুটতে হতো ঢাকার শাহবাগে। লিটনের উদ্যোক্তা হওয়ার মধ্য দিয়ে ফুলের সহজলভ্যতা বাড়িয়ে তুলেছিলো ফুলের প্রতি ভালোবাসা, বিনিময় ও নিবেদনের মাধ্যম।

মাত্র হাজার খানেক টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেন ফুলের ব্যবসা। প্রথমে নবীনগর উপজেলার মতন একটি মফস্বলে ফুলের ব্যবসা শুরু করা ছিলো তার কাছে খুবই চ্যালেজিং। বর্তমানে উপজেলায় নতুন উদ্যোক্তাদের ভিড়ে ব্যবসায় প্রতিযোগিতা বাড়লেও আর্টিফিশিয়ালি (প্লাস্টিক) ফুলে বাড়ছে হতাশা।

উপজেলা সদরের নিউ মার্কেটের টিনের ঘরে শুরুটা তার জীবনের জন্য এক অন্য রকম আবেগের সময় ছিলো বলে জানান লিটন। এনালগ সময়টায় তরুন-তরুনীদের সহজেই আকর্ষণ করেছিলো তার ফুলের দোকান। স্কুল-কলেজের মাঝামাঝিতে নিউ মার্কেটের সারি সারি দোকানের মাঝ খান দিয়ে পথ ছিলো আরো দৃষ্টি সীমায়। তিনি আপ্লুত হয়ে বলছিলেন শুরুর সেই সময়ের নানা কথা।

তখনকার সময়ে ভালোবাসা দিবসে বিক্রয় করার জন্যে গোলাপ ফুল এনে পড়েছিলেন ভয়ে। বিক্রি হবে তো! পরে গোলাপের বিক্রি দেখে হতাশা ভাঙ্গে তার। তৎকালিন গোলাপের বিক্রি-ই আরো সাহস যোগায় তার। নবীনগর উপজেলাবাসীকে দেশীয় ও পরিচিত ফুলের পাশাপাশি পরিচয় করান নানা বিদেশী ও দীর্ঘ দিন ধরে টাটকা ও প্রানবন্ত সতেজ থাকে এমন অসংখ্য ফুলের সাথে।

সারা বছর বিয়ে ও বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাহারী ফুল বিক্রি করতে পারলেও লিটনের মতো উপজেলার অন্যান্য ফুল ব্যবসায়ীদের লাভবান ব্যবসা হয় ভালোবাসা দিবস, পহেলা বৈশাখ ও বাংলাদেশের জাতীয় দিবস মহান বিজয় দিবস, মহান একুশে ফেব্রুয়ারী ও স্বাধীনতা দিবস ও পূজা-পার্বনে। এদিন গুলো স্থানিয় ফুল ব্যবসায়ীদের কাছে মরসুম হিসেবে উজ্জ্বীবিত থাকেন।

লিটন জানান, এক সময় নবীনগরে কেউ ফুলের ব্যবসা করবে এমনটা ভাবনা ছিলো নিজের পায়ে কুড়াল মারার মতো। বর্তমানে ফুলের ব্যবসা প্রতিযোগিতাপূর্ণ হলেও কাঁচা ফুলের জায়গা নিয়ে নিচ্ছে প্লাস্টিক ফুল। এছাড়া সিজনাল ব্যবসায়ীদের কারনে ফুল ব্যবসায়ীদের হতাশায় পড়তে হচ্ছে।

লিটন আরো জানান, এক সময় ফ্রিজিং ব্যবস্থা ছিলো না, ফুল ২-৩ দিনের মধ্যে শুকিয়ে যেতো। শুকিয়ে ও পঁচে যাওয়ার আগে ফুল না বেঁচতে পারলে লোকসান গুনতে হতো। লাভের বদলে পূঁজিও চলে যেতো। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভরসায় এখন পর্যন্ত এ ব্যবসায় টিকে আছি।

৩ ছেলে ও ১ মেয়ের জনক লিটন সরকারের ফুলের ব্যবসা ও সাংসারিক জীবনের বাইরেও এক আধ্যাত্বিক জীবন যাপন করে চলেছেন। আর্টিফিশিয়াল (প্লাস্টিক) ফুল, প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্যবস্থা ও সিজনাল ব্যবসায়ীদের কারনে বর্তমানে উর্দ্ধগতির বাজারে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। খুব আবেগ ও হতাশা নিয়ে বলেন, আমরা তো সরকারি চাকরিজীবিও না, নিজস্ব নার্সারিতে উৎপাদনকারি কোন উদ্যোক্তাও না। আমাদের জীবন আমাদেরই টেনটুনে মৃত্যুর কাছে নিয়ে যেতে হয়। আমাদের মতন উদ্যোক্তারা সব সময়ই অবহেলায় থাকি। লোন-মহাজনের খপ্পরে পড়লে তো আরো মহা বিপদ!

আরও পড়ুন