
ওসমান গনি, চান্দিনা প্রতিনিধি
ঋতুচক্রের আবর্তনে বর্ষা এলেই প্রকৃতি যেন তার রূপের ডালি উজাড় করে দেয়। কোথাও পাহাড়ের গায়ে মেঘের আনাগোনা, কোথাও আবার থৈ থৈ জলরাশির বুকে সবুজের মেলা। বর্ষার এমন এক অনন্য ও নয়নাভিরাম রূপ দেখতে হলে চলে যেতে হবে কুমিল্লার চান্দিনায়। সেখানে দর্শনার্থীদের মধ্যে পরম মুগ্ধতা ছড়িয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকছে এক মায়াবী জলাশয়, যার নাম ঘুঘরার বিল। প্রতিবছর বর্ষাকাল এলেই এই বিলটি এক নতুন ও মোহনীয় রূপে সেজে ওঠে, যা অনায়াসেই যেকোনো ভ্রমণপিয়াসী মানুষের মন কেড়ে নেয়।
ভৌগোলিক দিক থেকে ঘুঘরার বিলের অবস্থান অত্যন্ত চমৎকার ও বৈচিত্র্যময়। কুমিল্লার চান্দিনা, দাউদকান্দি এবং চাঁদপুরের কচুয়া, এই তিন উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষে গড়ে উঠেছে এই বিশাল বিলের বিস্তৃতি। দূর কিংবা কাছ থেকে, যেদিক থেকেই এই বিলের পানে তাকানো হোক না কেন, মনে হবে প্রকৃতি যেন নিজের আপন মহিমায় পরম যত্নে সাজিয়েছে এই পুরো এলাকাকে। দিগন্তবিস্তৃত বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর দিয়ে যখন হিমেল হাওয়া বয়ে যায়, তখন বিলের জল তরঙ্গে যে নাচন ওঠে, তা দেখার মতো এক দৃশ্য তৈরি করে।
ঘুঘরার বিল একদিকে যেমন এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে কাজ করছে, অন্যদিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও এর রয়েছে ব্যাপক আকর্ষণীয় দিক। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ মালিকানা মিলিয়ে এই উন্মুক্ত বিলের আয়তন প্রায় শত একরের কাছাকাছি। বিশাল এই জলমহালটি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে প্রাকৃতিক সম্পদে পূর্ণ এক অনন্য পর্যটন স্পট হিসেবে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে এই বিলটি এখন এই অঞ্চলের অন্যতম লাইফলাইন বা জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত।
জীববৈচিত্র্যের এক বিশাল আধার এই ঘুঘরার বিল। জলজ সম্পদ ও বিভিন্নপ্রাণীর এক অপূর্ব সহাবস্থান দেখা যায় এখানে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, এই বিলে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ রকমের দেশি প্রজাতির সুস্বাদু মাছ পাওয়া যায়। দেশীয় মাছের এই বিশাল ভাণ্ডার অঞ্চলের আমিষের চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রাখছে। মাছের পাশাপাশি বিলের জলজ ইকোসিস্টেমে রয়েছে সাপ, ব্যাঙসহ বিবিধ প্রজাতির জলজ প্রাণী। শুধু তাই নয়, বছরজুড়েই এখানে দেখা মেলে নানা জাতের মৌসুমি পাখির অবাধ বিচরণ। কিচিরমিচির শব্দে পাখির ডানা ঝাপটানোর দৃশ্য বিলের শান্ত পরিবেশকে জীবন্ত করে তোলে।
এই বিলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা লাল ও সাদা প্রজাতির শাপলা। বর্ষার পানিতে যখন মাইলের পর মাইল এলাকা প্লাবিত হয়, তখন পানির ওপর মাথা তুলে দাঁড়ায় হাজার হাজার রঙিন শাপলা। এই ফুটন্ত শাপলা বিলের সৌন্দর্যকে বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। বিশেষ করে ভোরের আলো যখন বিলের শান্ত পানির ওপর এসে পড়ে, তখন দিগন্তবিস্তৃত বিস্তীর্ণ জলরাশি আর লাল-সাদা শাপলার অপরূপ মেলবন্ধন সৌন্দর্য পিপাসুদের মনকে দোলা দিয়ে যায়। পানির নিচে নিমজ্জিত আছে বিভিন্ন প্রজাতির আকর্ষণীয় শৈবাল, কচুরিপানাসহ হরেক রকমের জলজ উদ্ভিদ, যা পানির ওপর থেকে দেখলে মনে হয় পানির নিচে এক অন্য জগৎ লুকিয়ে আছে।
ঘুঘরার বিল শুধু যে রূপের আধার তা কিন্তু নয়, এটি স্থানীয় মানুষের জীবিকারও এক বড় উৎস। শুষ্ক ও বর্ষা মৌসুম মিলিয়ে বছরে দুবার এখানে ধানের বাম্পার ফলন হয়। বিলের উর্বর পলিমাটিতে ফলে সোনাঝরা ধান। তবে কৃষির পাশাপাশি সারা বছর জুড়েই মাছ ধরা এই অঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান পেশা। জাল ফেলে বা নৌকায় করে মাছ ধরার চিরাচরিত গ্রামীণ দৃশ্য বিলের বুকে সার্বক্ষণিক এক কর্মচাঞ্চল্য বজায় রাখে।
ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এই বিলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো শান্ত পানিতে নৌভ্রমণ। এখানে যাতায়াত এবং ঘোরার একমাত্র ঐতিহ্যবাহী পরিবহন মাধ্যম হলো ডিঙ্গি নৌকা। শান্ত জলের বুক চিরে যখন এই ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকাগুলো এগিয়ে চলে, তখন পর্যটকরা প্রকৃতির একেবারে কাছাকাছি চলে যেতে পারেন। শাপলার বনে নৌকার অবাধ বিচরণ এবং চারপাশের শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ নিমেষেই শহুরে জীবনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।
প্রকৃতির এই অপরূপ সৃষ্টি ঘুঘরার বিলকে যদি যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে আরও রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়, তবে এটি দেশের অন্যতম প্রধান পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। বর্ষার এই দিনগুলোতে যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা সময় বের করে প্রকৃতির এই নয়নাভিরাম জলছবি দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন অসংখ্য মানুষ, আর ফিরে যাচ্ছেন এক বুক মুগ্ধতা নিয়ে।
সম্পাদক : শাদমান আল আরবী | নির্বাহী সম্পাদক : তানভীর আল আরবী
ঠিকানা : ঝাউতলা, ১ম কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০। ফোন : ০১৩১৬১৮৬৯৪০, ই-মেইল : [email protected], বিজ্ঞাপন: [email protected], নিউজরুম: [email protected] © ২০২৩ রাইজিং কুমিল্লা সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত। | Design & Developed by BDIGITIC