
মিথিলা হক তুলি
গল্পের সূচনা কোথা হইতে করিব, তাহা বুঝিতে পারিতেছি না। তবে চোখ বন্ধ করিলে যাহা আজও স্মরণে উদয় হয়, তাহাই লিখিতে বসিয়াছি আজ।
ভাদ্র মাসের এক তপ্ত দুপুরবেলা। রাম ঘোষাল তাহার বাড়ির উঠানে আনমনে বসিয়া কী যেন ভাবিতেছিল। শূন্য দাওয়ায় বসিয়া মা ঠাকুরুন তাহা লক্ষ্য করিতেছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ দেখিবার পর তিনি কিছু না বলিয়াই নিজ কর্মে চলিয়া গেলেন।
রাম ঘোষালের সংসার ছোট। দুই কন্যা ও পত্নীকে লইয়াই তাহার বসবাস এই বৃহৎ গৃহে। এককালে তাহার আত্মীয়-পরিজনের সংখ্যা কম ছিল না। কিন্তু বর্তমানে এই বাড়িতে তিনি এবং তাহার তিন ভ্রাতার পরিবারের অল্পসংখ্যক লোকের বসবাস। এক সময় লোকজনে পূর্ণ ছিল এই গৃহ।
রাম ঘোষালের পিতা হরিনাথ ঘোষাল। তিনি ছিলেন সে সময়ের এক হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। তাহার মাসিক বেতন ছিল মাত্র চারশত টাকা। চার পুত্র ও চার কন্যাকে লইয়া সংসার চালাইতে গিয়া প্রায়ই বিপাকে পড়িতেন তিনি।
তবে রাম ঘোষালের মাতা তিলোত্তমা দেবীর পিতৃকুল ছিল নামকরা। তাহাদের বংশের বহু ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান তিলোত্তমা দেবীর স্বামীর অবস্থান হইতে বহুগুণে উন্নত ছিল। এই কারণে স্বামীর সংসারে প্রায়ই টানাপোড়েন দেখা দিত। সেই পরিস্থিতি হইতে রক্ষা পাইবার জন্য তিলোত্তমা দেবী ছোটবেলায় রাম ঘোষালকে তাহার নানাবাড়িতে পাঠাইয়া দেন।
এই গৃহে রাম ঘোষালের যাতায়াত থাকিলেও তাহার শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত হয় নানাবাড়িতে। পরবর্তীকালে পড়াশোনা সমাপ্ত করিয়া তিনি সংসারের দায়িত্ব গ্রহণের উদ্দেশ্যে চাকরিতে প্রবেশ করেন।
চাকরির প্রশিক্ষণকালেই রাম ঘোষালের জীবনে এক অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটিয়া যায়। এক কাকডাকা ভোরে তাহার এক চাচাতো ভাই উপস্থিত হয় রাম ঘোষালের নিকট। সে সময় রাম ঘোষাল চট্টগ্রামে প্রশিক্ষণরত ছিলেন। তাহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা অনিমেষ ঘোষালও তখন চট্টগ্রামেই কর্মরত ছিলেন। চাচাতো ভাই এবং অনিমেষ ঘোষাল রাম ঘোষালের নিকট উপস্থিত হইয়া শুধু বলিলেন—“বাবার শরীর ভালো নয়, অনিমেষকে অবিলম্বে বাড়ি যাইতে হইবে।” যদিও তাহারা স্পষ্টভাবে কিছু বলিলেন না, তথাপি রাম ঘোষালের বুঝিতে আর বাকি রহিল না যে তাহার পিতা আর এই পৃথিবীতে জীবিত নাই। এইভাবেই সময় অতিক্রান্ত হইতে থাকিল।
একসময় রাম ঘোষাল বিবাহ করিলেন। তাহার সংসারে জন্ম লইল দুই কন্যা—বড় কন্যা অলকানন্দা এবং ছোট কন্যা আশালতা। ক্রমে তাহারা বড় হইতে লাগিল। অবশেষে রাম ঘোষাল চাকরি হইতে অবসর গ্রহণ করিয়া গৃহে ফিরিয়া আসিলেন। পেনশনের অর্থেই তাহার সংসার চলিতে লাগিল। অলকানন্দা ও আশালতাকে কেন্দ্র করিয়াই তাহাদের ছোট চারজনের সংসার। বেশ শান্তিপূর্ণভাবেই কাটিতেছিল তাহাদের দিন।
বড় কন্যা কলেজ সমাপ্ত করিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইল। ছোট কন্যা স্কুল শেষ করিয়া কলেজে ভর্তি হইল। কিন্তু এই সময়েই রাম ঘোষালের পরিবারে দুঃখের ছায়া নেমে আসে। দেশে তখন একপ্রকার মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটিয়াছিল। সেই সময় হঠাৎ করিয়াই তাহার ছোট ভাই বিলের পানিতে পড়িয়া প্রাণ হারায়। তাহার পরিবারে নেমে আসে অসহনীয় শোক। ভাইয়ের দুইটি ছোট পুত্র তখন কার্যত অনাথ হইয়া পড়ে। এইভাবে দিন গড়াইয়া মাস, মাস গড়াইয়া বছর অতিবাহিত হইতে লাগিল। এদিকে আশালতার কলেজের চূড়ান্ত পরীক্ষা উপস্থিত হইল। সে এইচ.এস.সি পরীক্ষা দিল এবং উত্তম ফলাফলসহ উত্তীর্ণ হইল। তাহার স্বপ্ন ছিল একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইবার। কিন্তু সকলের সকল স্বপ্ন পূর্ণ হয় না। তথাপি আশালতা এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইতে সক্ষম হইল।
সেখানে তাহার দিনকাল বেশ ভালোই কাটিতে লাগিল। নতুন পরিবেশে নতুন বন্ধু-বান্ধবের সহিত পরিচয় ঘটিল। অলকানন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করিয়া একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি লাভ করিল। পরবর্তীকালে তাহার বিবাহ সম্পন্ন হইল।
দিদির বিবাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হইয়া আশালতার পরিচয় ঘটে এক যুবকের সহিত। তাহার নাম অভি। অভি মুসলিম পরিবারের সন্তান। রাম ঘোষালের সহিত অভির পিতার পূর্বপরিচয়ের সূত্রেই সে অলকানন্দার বিবাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল। সেইখানেই আশালতার সহিত তাহার পরিচয় হয়।
ক্রমে তাহাদের আলাপ বাড়িতে লাগিল এবং একসময় তাহা বন্ধুত্বে পরিণত হইল। কিছুদিন পর অনেকের নিকটই মনে হইতে লাগিল যে তাহাদের সম্পর্ক কেবল বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। বিবাহ অনুষ্ঠান শেষ হইবার পর আশালতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরিয়া গেলেও অভির সহিত তাহার যোগাযোগ অব্যাহত থাকিল। প্রথমদিকে আশালতা ভাবিয়াছিল, ইহা কেবল বন্ধুত্ব মাত্র। কিন্তু দিন যত অগ্রসর হইতে লাগিল, তাহার মনে দৃঢ় হইতে লাগিল যে এই সম্পর্ক বন্ধুত্বের সীমা অতিক্রম করিয়াছে। আশালতা প্রথমে এই সম্পর্ককে ভালোবাসায় রূপ দিতে চাহে নাই। কিন্তু ধীরে ধীরে সে অভির প্রতি দুর্বল হইয়া পড়ে। আর অভি একদিন বলিয়াছিল—
[caption id="attachment_57807" align="alignnone" width="1200"]
লেখক: মিথিলা হক তুলি[/caption]
“ভালোবাসিলেই কি বিবাহ করিতে হইবে? বিবাহ না করিয়াও তো ভালোবাসা যায়।” এই একটি কথার ফাঁদেই আশালতা বন্দী হইয়া গেল। ক্রমে তাহাদের সম্পর্ক গভীরতর হইতে লাগিল। মাঝে মাঝে তাহাদের সাক্ষাৎ ঘটিত, আর প্রতিদিনই কথোপকথন চলিত। সময়ের সহিত সহিত তাহাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হইয়া উঠিল। অভির পারিবারিক অবস্থা তেমন সচ্ছল ছিল না। তাহার পড়াশোনার ব্যয় নিজেকেই বহন করিতে হইত। সেই কারণে আশালতা নিজের খরচের অর্থ সঞ্চয় করিয়া মাঝে মাঝে অভিকে সাহায্য করিত।
একসময় আশালতার বন্ধুরাও তাহাদের সম্পর্কের বিষয়টি জানিতে পারে। তাহারা ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করিয়া আশালতাকে এই সম্পর্ক হইতে সরে আসিবার পরামর্শ দেয়। কিন্তু তখন আর সেই সম্পর্ক হইতে মুক্ত হওয়া আশালতার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এইভাবেই দ্বিধা, দুঃচিন্তা ও টানাপোড়েনের মধ্যে তাহাদের দিন অতিবাহিত হইতে লাগিল। একদিন অভির এক বন্ধুর মাধ্যমে তাহার মাতা জানিতে পারেন যে অভির এক হিন্দু কন্যার সহিত সম্পর্ক রহিয়াছে। এই সংবাদ শুনিয়া নাকি তিনি অসুস্থ হইয়া পড়েন। অভির পিতাও পূর্ব হইতেই অসুস্থ ছিলেন। অভির দুই বড় বোনের বিবাহ আগেই সম্পন্ন হইয়াছিল। অভিই ছিল তাহার পিতা-মাতার শেষ বয়সের একমাত্র ভরসা।
অবশেষে অভি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল যে সে আশালতার সহিত আর কোনো সম্পর্ক রাখিবে না। সে ধীরে ধীরে আশালতাকে উপেক্ষা করিতে লাগিল। কিন্তু আশালতার পক্ষে এই বিচ্ছেদ মেনে নেওয়া সম্ভব হইল না। সে ক্রমশ হতাশার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হইতে লাগিল। অভি তাহাকে অনেক বুঝাইবার চেষ্টা করিল—“আমরা কোনোদিন একসাথে থাকিতে পারিব না, ইহা কখনো সম্ভব নয়।” কিন্তু আশালতা তাহা মানিতে পারিল না।
সে ঈশ্বরের নিকট একটাই প্রার্থনা করিত— “আমি আর বাচিঁতে চাই না। হে ঈশ্বর, তুমি আমাকে তোমার কাছে লইয়া যাও।”
দিন যত গড়াইতে লাগিল, আশালতার যন্ত্রণা ততই বাড়িতে লাগিল। একসময় সে তাহার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের নিকট সমস্ত কথা ব্যক্ত করিল। শিক্ষক তাহাকে এই কষ্ট হইতে মুক্ত হইবার বহু উপদেশ দিলেন। কিন্তু সাময়িক স্বস্তি লাভ করিলেও আশালতা সম্পূর্ণভাবে এই যন্ত্রণা হইতে মুক্ত হইতে পারিল না।
অবশেষে একদিন সে ভয়ংকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল। এক দুপুরবেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের কক্ষে সিলিং ফ্যানের সহিত নিজেকে ঝুলাইয়া সে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করিল। সন্ধ্যার সময় তাহার রুমমেট কক্ষে ফিরিয়া দরজা ভিতর হইতে বন্ধ দেখিয়া মনে করিল আশালতা হয়তো ঘুমাইতেছে। সে দরজায় বারংবার আঘাত করিল। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অতিবাহিত হইলেও কোনো সাড়া না পাইয়া জানালার ফাঁক দিয়া তাকাইয়া দেখিল—ফ্যানের সহিত ঝুলিয়া রহিয়াছে আশালতার নিথর দেহ। অভিও শুনিয়াছিল আশালতার এই আত্মহননের সংবাদ। কিন্তু শেষবারের মতো সে আশালতাকে দেখিতে আসিয়াছিল কি না—ভিড়ের মধ্যে কেহ তাহা লক্ষ্য করে নাই। নিষ্পাপ কন্যা আশালতার দোষই বা কি ছিল? শুধুমাত্র অন্য কারো জন্যই সে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিল। হায়, নিয়তির কী নির্মম পরিহাস!
লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
সম্পাদক : শাদমান আল আরবী | নির্বাহী সম্পাদক : তানভীর আল আরবী
ঠিকানা : ঝাউতলা, ১ম কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০। ফোন : ০১৩১৬১৮৬৯৪০, ই-মেইল : [email protected], বিজ্ঞাপন: [email protected], নিউজরুম: [email protected] © ২০২৩ রাইজিং কুমিল্লা সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত। | Design & Developed by BDIGITIC