
তামিম মিয়া
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার বড় একটি অংশ হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। ১৮ থেকে ৩৫ বছরের তরুণ ভোটারেরা মোট ভোটারদের মধ্যে বড় একটি শক্তি। শুধুমাত্র সংখ্যার দিক থেকেই নয়, বরং রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায়, বিপ্লবে, মূল্যবোধে, নতুন সমাজ বিনির্মাণে অন্যদের থেকে তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি গতিশীল এবং সক্রিয়। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান সময় পর্যন্ত দেশ গঠনে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ফলে তরুণ সমাজের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার অন্যতম শর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে বর্তমানে তরুণদের মধ্যে দ্বৈত চিন্তা ধারার প্রতিফলন লক্ষ করা যাচ্ছে। একদিকে তারা যেমন রাজনৈতিক ভাবনার কৌতূহলী, অন্যদিকে দ্বিধাগ্রস্তও। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, অস্থিরতা, ভুয়া তথ্য প্রবাহের কারণে অনেকের মাঝে এই দ্বৈত চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ ঘটে।
ইসির তথ্য মতে, বাংলাদেশের মোট ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৪৪ লাখ। এর মধ্যে ১৮ থেকে ২৯ বছরের ভোটারদের তরুণ ধরা হয়েছে, যাদের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটির কাছাকাছি, যা মোট ভোটারের ৩০ শতাংশ। বিগত জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে তরুণরা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান এই তরুণ সমাজের। যারা আহত কিংবা শহিদ হয়েছে, তাদের বড় একটি অংশ হচ্ছে তরুণ। সুতরাং সংস্কার ও রাষ্ট্র কাঠামো পরিবর্তনে তরুণদের অবদান অবিস্মরণীয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণদের মনোভাব ভিন্ন হয়ে থাকে। তাঁরা একদিকে যেমন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থেকে দেশের পরিবর্তন আনতে চায়, অন্যদিকে রাজনৈতিক পক্রিয়ায় অংশগ্রহণে ভয়ের সংস্কৃতিও কাজ করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তরুণদের রাজনৈতিক আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক, ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট, ভিডিও তৈরিতে আগ্রহ থাকলেও বাস্তবিক ভাবে দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ, কার্যক্রম পরিচালনা কিংবা সাংগঠনিক কোনো আন্দোলনে তাদের সক্রিয়তা তুলনামূলক ভাবে কম।
কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা একসময় যেখানে নেতৃত্ব তৈরী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, এখন তা কয়েকটি নির্দিষ্ট সংগঠনের বিভক্ত হয়ে পেশিশক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ভিন্ন মতাদর্শ পোষণ করলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার ধারণার কারণেও তরুণরা রাজনীতি থেকে দূরে সরে আসছে। ফলে, তারা রাজনৈতিক ভাবে সচেতন হলেও সক্রিয় ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হতে দ্বিধাগ্রস্ত।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহিংসতা একটি নিয়মিত চিত্র। নির্বাচনের সময় হরতাল-অবরোধ, সংঘর্ষ, সহিংসতা কিংবা ক্যাম্পাসে দলীয় সংঘর্ষ তরুণদের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। এর ফলে তরুণদের বড় একটি অংশ সহিংসতার ভয়ে নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে রাজনীতিকে এড়িয়ে চলে। বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক দলের মধ্যেই গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপূর্ণ বিকাশ এখনো হয়নি, যার কারণে নেতৃত্বের জায়গায় স্থায়ীভাবে একদল মানুষই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
অনেক তরুণই মনে করে নতুন নেতৃত্ব কিংবা নতুন চিন্তাকে জায়গা দেওয়ার মতো উন্মুক্ত রাজনৈতিক চর্চা এখনো দেশে তৈরি হয়নি। যার ফলে দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের আগ্রহ তাদের মধ্যে কমে যায়। এছাড়াও দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদি বিষয়গুলো তরুণদের মাঝে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি করছে, প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রতি তরুণদের আস্থা কমে এসেছে। যার কারণে তারা ভাবছে নীতি নির্ভর রাজনীতি বাংলাদেশে সম্ভব নয়, ফলে দলগত রাজনীতিকে তারা অর্থহীন মনে করছে।
বেকারত্ব, চাকরির সংকট ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে কিছুটা প্রভাবিত করে। রাজনীতিতে সময় দিতে গিয়ে নিজের ক্যারিয়ার ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পিছিয়ে না থেকে সুন্দর ক্যারিয়ার গড়াই তাদের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও ভুয়া তথ্যের সমাহার ও নিরপেক্ষ তথ্যের অভাবে অনেকে মাঝে রাজনীতির প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এ সকল সংকট সমূহ কি তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথকে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিবে, নাকি সেই সম্ভাবনার পথকে আরো প্রশস্ত করে তুলবে? এর উত্তর নির্ভর করবে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সমাজের শৃঙ্খলা ও তরুণদের ইতিবাচক রাজনৈতিক ভাবনার উপর।
৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত ঐতিহাসিক ভাবেই দেশের যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে তরুণরা অগ্রপথিকের ভূমিকা পালন করে আসছে। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে তরুণদের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক আকাঙ্খা তৈরি হয়েছে। তরুণরা এখন পেশি শক্তির বিপরীতে মেধা ও নীতি নির্ভর রাজনীতিতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তারই ধারাবাহিকতায় দেশের অনেক তরুণই ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ইচ্ছে পোষণ করছে।
রাজনৈতিক দল গুলো যদি তরুণদের জন্য একটি স্বচ্ছ ও নীতি নির্ভর রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক আমূল পরিবর্তন আসবে বলে প্রত্যাশা। তরুণদের রাজনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় করার জন্য রাষ্ট্রের উচিত তাদের বেকারত্ব দূর করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ প্রদান ও স্টার্টআপ ফান্ডিয়ের মাধ্যমে তরুণদের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। আর্থিক স্বচ্ছলতা ব্যতীত কোনো তরুণই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠতে চাইবে না।
তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কেবল ভোটের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং একটি শোষনমুক্ত সমৃদ্ধির দেশ গঠনে অপরিহার্য অংশ। তরুণদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে যদি সঠিক রাজনৈতিক কাঠামোতে কাজে লাগানো যায়, তাহলে পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ও আধুনিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখা যাবে। আজকের তরুণরাই হবে আগামী রাষ্ট্র গঠনের মূল কারিগর।
সম্পাদক : শাদমান আল আরবী | নির্বাহী সম্পাদক : তানভীর আল আরবী
ঠিকানা : ঝাউতলা, ১ম কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০। ফোন : ০১৩১৬১৮৬৯৪০, ই-মেইল : [email protected], বিজ্ঞাপন: [email protected], নিউজরুম: [email protected] © ২০২৩ রাইজিং কুমিল্লা সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত। | Design & Developed by BDIGITIC