
মাঘের কনকনে শীতের সকালে কুয়াশা ভেদ করে সূর্য উঁকি দিলেও চান্দিনার মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানগুলোতে রাজনৈতিক উত্তাপ তার আগেই তুঙ্গে পৌঁছেছে। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে স্থানীয় ভোটারদের আলোচনা-যুক্তি আর তর্কের কেন্দ্রবিন্দু এখন একটাই। আগামী ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কুমিল্লার এই গুরুত্বপূর্ণ আসনটিতে (কুমিল্লা-৭) বইছে ভোটের হাওয়া। তবে সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক কর্মীদের আড্ডায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কে হচ্ছেন ধানের শীষ বা জোটের একক কান্ডারি?
চান্দিনা উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের চায়ের দোকানে এখন রাজনীতির পাঠশালা। দীর্ঘ সময় পর একটি অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অন্যরকম উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। তবে এই উদ্দীপনার পাশাপাশি বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে সংশয়। বিশেষ করে বিএনপি ও এর মিত্র জোটের একক প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় নির্বাচনী সমীকরণ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
এই আসনের রাজনীতিতে বর্তমানে দুই মেরুতে অবস্থান করছেন চান্দিনা উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুল আলম শাওন এবং এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ। উপজেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে আতিকুল আলম শাওন তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছেন। গত দেড় দশকে প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজপথে থাকা এবং নেতা-কর্মীদের আগলে রাখার কারণে তরুণ ও তৃণমূল কর্মীদের বড় অংশই তাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখছেন। তাদের দাবি, দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতা হিসেবে শাওনই ধানের শীষের যোগ্য দাবিদার।
অন্যদিকে, ড. রেদোয়ান আহমেদ এই আসনের রাজনীতির এক পরিচিত মুখ। সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং বিগত বছরগুলোর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ ভোটারদের একাংশের কাছে তিনি এখনো জনপ্রিয়। বিএনপি জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে তার রাজনৈতিক ওজন তাকে লড়াইয়ে অনেকখানি এগিয়ে রেখেছে। ফলে জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে তার প্রার্থিতা পাওয়ার সম্ভাবনা জোরালো। কিন্তু বিএনপির স্থানীয় একটি বড় অংশ এবার জোটের পরিবর্তে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে অনড় অবস্থান নেওয়ায় ‘মনোনয়ন যুদ্ধ’ এখন চান্দিনার চায়ের আড্ডার প্রধান মুখরোচক বিষয়।
এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মোশাররফ হোসেন। জামায়াত তাদের সুসংগঠিত সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে গ্রামে গ্রামে জনসংযোগ চালাচ্ছে। যদিও দলের ভেতরে প্রার্থী নিয়ে কিছু ভিন্নমত শোনা যাচ্ছে, তবুও ভোটের মাঠে তারা বড় এক ফ্যাক্টর। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা এহতেশামুল হক কাসেমী এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা সোলাইমান খান নিজ নিজ প্রতীকে সরব রয়েছেন। তারা মূলত ইসলামী ভোট ব্যাংক এবং ক্লিন ইমেজের ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করছেন।
চান্দিনার সচেতন ভোটাররা মনে করছেন, এবারের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হবে ‘একক প্রার্থী’ ইস্যু। যদি বিএনপি ও এলডিপি শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ হয়ে একজন প্রার্থী দিতে না পারে, তবে ভোট ভাগাভাগির সুবিধা অন্য প্রার্থীরা পেয়ে যেতে পারেন। বিশেষ করে ভোটারদের বড় একটি অংশ যারা পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছেন, তারা দ্বিধায় পড়ে যেতে পারেন।
ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে চান্দিনার রাজনৈতিক মাঠ আরও উত্তপ্ত হচ্ছে। মনোনয়ন নিয়ে এই দোলাচল কবে শেষ হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে রাজপথের আসল লড়াই। আপাতত ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতির অপেক্ষায় চান্দিনাবাসী। তবে সবার চোখ এখন রাজধানীর দিকে, কেন্দ্র থেকে কার হাতে পৌঁছায় চূড়ান্ত মনোনয়নের চিঠি?










