মঙ্গলবার ৩ মার্চ, ২০২৬

চান্দিনা ভূমি অফিসে দুর্নীতির মহোৎসব: ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না, জিম্মি সাধারণ মানুষ

ওসমান গনি, চান্দিনা প্রতিনিধি

Rising Cumilla - Chandina Upazila Land Office, Cumilla
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা ভূমি অফিস/ছবি: প্রতিনিধি

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মে সাধারণ মানুষ এখন চরম দিশেহারা। জমির খাজনা পরিশোধ থেকে শুরু করে নামজারি পর্যন্ত প্রতিটি দাপ্তরিক কাজেই ঘুষ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী অনলাইনে নামজারি প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও এই দপ্তরে দালালদের মধ্যস্থতা ছাড়া কোনো কাজই এগোয় না। মূলত প্রতিটি ফাইলের ওপর দালালের সাথে চুক্তির বিশেষ ‘সাংকেতিক চিহ্ন’ না থাকলে সংশ্লিষ্টরা নানা অজুহাতে আবেদনটি বাতিল করে দেন। এতে সাধারণ মানুষ যেমন অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনলাইনে আবেদনের পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা আবেদনের হার্ড কপি দাবি করেন এবং এর পেছনে কোন দালাল রয়েছে তা খোঁজেন। নির্ধারিত দালাল না থাকলে ভূমি কর্মকর্তা সরাসরি আবেদনকারীর সাথে চুক্তিতে যান। চুক্তির পর ফাইলের ওপর বিশেষ চিহ্ন দেওয়া হয়, যা দেখে পরবর্তী ধাপের কর্মকর্তারা ফাইলটি অগ্রসর করেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি সপ্তাহের শেষে এই চিহ্নযুক্ত ফাইলের হিসাব অনুযায়ী ঘুষের টাকা লেনদেন করা হয়। চূড়ান্ত শুনানি ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে খোদ সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সাল আল নুর নিজেই চুক্তিতে লিপ্ত হন বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। যারা এই অনৈতিক চুক্তিতে রাজি হন না, তাদের আবেদনগুলো ত্রুটি দেখিয়ে নামঞ্জুর করে দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগীদের জবানবন্দিতে এই দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। উপজেলার হারং গ্রামের আব্দুল হক জানান, তার এক আত্মীয়ের নামজারি করাতে দেড় লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। এমনকি কেরণখাল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যানকেও ৯০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে কাজ করাতে হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সহকারী অধ্যাপক জানান, চান্দিনা বাজারের একটি নামজারির জন্য দুই লক্ষ টাকা চুক্তিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। একইভাবে কালিয়ারচর গ্রামের আব্দুল আলী খোন্দকার দুবার আবেদন করেও কাজ পাননি, কারণ তিনি তহসিলদারের সাথে টাকার চুক্তিতে যাননি। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর নির্দিষ্ট দালালদের নিয়ে রাত ১০-১১টা পর্যন্ত চলে এই অবৈধ লেনদেনের হিসাব-নিকাশ।

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সাল আল নুর সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, তাকে কেউ ঘুষ দিয়েছে এমন কোনো প্রমাণ বা ভিডিও কেউ দেখাতে পারবে না এবং এই অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে ঘুষ লেনদেনের ভিডিও বা প্রমাণ সাধারণ মানুষের কাছে থাকা কতটা বাস্তবসম্মত—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, কেউ ঘুষ দিলে তার কাছে প্রমাণ থাকাটাই স্বাভাবিক। কর্তৃপক্ষের এমন অবস্থানে স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং এই দুর্নীতির চক্র ভাঙতে ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন

আরও পড়ুন