বৃহস্পতিবার ৫ মার্চ, ২০২৬

চান্দিনার রাস্তার ধারে বসন্তের বার্তা ছড়াচ্ছে ভাঁটফুল

ওসমান গনি, চান্দিনা প্রতিনিধি

Rising Cumilla - The daisies are spreading the message of spring along the roadside of Chandina
চান্দিনার রাস্তার ধারে বসন্তের বার্তা ছড়াচ্ছে ভাঁটফুল/ছবি: প্রতিনিধি

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বিভিন্ন রাস্তার ধারে, ঝোপঝাড় ও বনজঙ্গলে এখন মুগ্ধতার আবহ ছড়িয়ে দিচ্ছে বসন্তের অন্যতম পরিচিত বুনো ফুল, ভাঁটফুল। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি যেন নতুন সাজে সেজে উঠেছে। শীতের আমেজ ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে, চারদিকে বইছে মৃদু উষ্ণ বাতাস, আর সেই সময়েই প্রকৃতির বুকে নিঃশব্দে ফুটে উঠেছে ভাঁটফুলের শুভ্র সৌন্দর্য।

বসন্তকালে প্রকৃতি নানা রঙের ফুলে সেজে ওঠে। তবে বাংলার গ্রামবাংলায় একটি বিশেষ ফুল প্রায় সবখানেই চোখে পড়ে, ভাঁটফুল। কুমিল্লার চান্দিনার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক, মেঠোপথ, খালপাড়, ফসলি জমির পাশে এবং ঝোপঝাড়ে স্বাভাবিকভাবেই জন্ম নিচ্ছে এ ফুলের গাছ। কোনো ধরনের চাষাবাদ বা বিশেষ পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেই নির্দিষ্ট সময়ে মাটি থেকে গজিয়ে ওঠে ভাঁটগাছ এবং বসন্ত এলেই গাছে গাছে ফুটে ওঠে অসংখ্য ফুল। ঋতুর শেষে আবার স্বাভাবিকভাবেই গাছগুলো শুকিয়ে যায় বা বিলীন হয়ে যায় প্রকৃতির নিয়মে।

স্থানীয়দের ভাষায়, বসন্ত এলে যেন ভাঁটফুল প্রকৃতির একটি নীরব বার্তা নিয়ে আসে। গ্রামীণ পথঘাটে চলাচলকারী মানুষের চোখে পড়ে সাদা বা হালকা বেগুনি আভাযুক্ত এই ফুলের সারি। বাতাসে দোল খেতে থাকা ফুলগুলো পথচারীদের মনকে মুহূর্তেই আনন্দে ভরিয়ে তোলে। বিশেষ করে সকালবেলা শিশিরভেজা ভাঁটফুলের সৌন্দর্য আরও বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

প্রকৃতির এই ফুল শুধু সৌন্দর্য ছড়িয়েই থেমে থাকে না, বরং জীববৈচিত্র্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভাঁটফুলের মধু সংগ্রহ করতে প্রতিদিন ভোর থেকে বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতি, মৌমাছি ও ছোট ছোট পতঙ্গ ফুলের চারপাশে ভিড় জমায়। এতে পরিবেশের প্রাকৃতিক খাদ্যচক্র ও পরাগায়নের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে এই বুনো ফুল। কৃষিবিদদের মতে, এ ধরনের বুনো ফুল প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শুধু সৌন্দর্য বা পরিবেশগত গুরুত্বই নয়, ভাঁটগাছের রয়েছে ঔষধি গুণও। গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে ভাঁটগাছের পাতা, শিকড় ও ফুল বিভিন্ন ধরনের ভেষজ চিকিৎসায় ব্যবহার হয়ে আসছে। লোকজ চিকিৎসায় জ্বর, চর্মরোগ, ব্যথা কিংবা কিছু প্রদাহজনিত সমস্যায় ভাঁটগাছের নির্যাস ব্যবহার করা হয় বলে অনেকেই মনে করেন। যদিও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এসব ব্যবহারের বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন।

চান্দিনার বিভিন্ন গ্রামের প্রবীণরা জানান, আগে গ্রামবাংলার পথে-ঘাটে ভাঁটফুল আরও বেশি দেখা যেত। কিন্তু নগরায়ন, রাস্তা সম্প্রসারণ এবং ঝোপঝাড় পরিষ্কারের কারণে অনেক জায়গায় এসব বুনো গাছ কমে যাচ্ছে। তবুও বসন্ত এলেই প্রকৃতির নিজস্ব শক্তিতে আবারও কোথাও না কোথাও ফুটে ওঠে ভাঁটফুল, যেন প্রকৃতি তার চিরন্তন সৌন্দর্য ধরে রাখতে চায়।

স্থানীয় তরুণদের অনেকেই এখন বসন্তকালে ভাঁটফুলের ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন। এতে প্রকৃতির এই সহজ-সরল সৌন্দর্য নতুন করে মানুষের নজরে আসছে। অনেকেই মনে করছেন, গ্রামীণ পরিবেশ ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষায় এমন বুনো ফুলের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে আরও সচেতন করা প্রয়োজন।

প্রকৃতির নিয়মেই প্রতি বছর বসন্তের আগমনে ভাঁটফুল ফুটে ওঠে এবং কিছুদিনের জন্য চারপাশে এক অপূর্ব সৌন্দর্যের আবহ তৈরি করে। কুমিল্লার চান্দিনার রাস্তার ধারে ফুটে থাকা এই ফুল যেন মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে সবসময় বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না; কখনও কখনও একটি ছোট্ট বুনো ফুলই যথেষ্ট মানুষের মন ভরিয়ে দিতে।

আরও পড়ুন