
রাইজিং কুমিল্লা ডেস্ক
কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলের কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি—কুমিল্লা বিমানবন্দর পুনরায় চালু করা। প্রবাসী-অধ্যুষিত এ অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষকে বিদেশযাত্রায় এখনো ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে বাড়তি সময়, অর্থ ও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের।
দেশের অন্যতম রেমিট্যান্সসমৃদ্ধ জেলা কুমিল্লা। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে জেলায় এসেছে ১৮৯ কোটি ২ লাখ মার্কিন ডলার প্রবাসী আয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের জেলাভিত্তিক সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে কুমিল্লা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পাওয়া জেলা। একই সময়ে নোয়াখালীতে এসেছে ৯৮ কোটি ৫৪ লাখ, ফেনীতে ৯২ কোটি ১৪ লাখ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৮৩ কোটি ৫৪ লাখ ডলার।
জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে কুমিল্লা থেকে ৪ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি মানুষ কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ৭৬ হাজার ৩৩১ জন, ২০২৪ সালে ৯২ হাজার ৯১১ জন, ২০২৩ সালে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫২০ জন, ২০২২ সালে ১ লাখ ৫ হাজার ৯৯৭ জন এবং ২০২১ সালে ৬৮ হাজার ৫৮৬ জন বিদেশে যান। তাদের অধিকাংশকেই ঢাকা অথবা চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কুমিল্লায় বিমানবন্দর থাকা সত্ত্বেও সেটি যাত্রী পরিবহনে ব্যবহার না হওয়া এ অঞ্চলের মানুষের জন্য বড় ধরনের বৈপরীত্য। বিশেষ করে কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিপুলসংখ্যক প্রবাসী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য বিমানবন্দরটি চালু হলে বিদেশযাত্রার সময় ও খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
চাঁদপুরের কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, সড়কপথে ঢাকায় গিয়ে বিমান ধরতে হলে যাত্রাপথেই অনেক সময় ব্যয় হয়। কুমিল্লা বিমানবন্দর চালু হলে চাঁদপুর ও আশপাশের এলাকার মানুষও তুলনামূলক সহজে বিমানবন্দরটি ব্যবহার করতে পারবেন।
একইভাবে নোয়াখালী ও ফেনীর বাসিন্দারাও কুমিল্লাকে একটি বিকল্প বিমান যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দাদের অনেকের মতে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসীদের যাতায়াত সহজ করতে কুমিল্লা বিমানবন্দর পুনরায় চালু করা প্রয়োজন। আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগ বাড়লে শুধু যাত্রীদের ভোগান্তিই কমবে না, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
কুমিল্লা বিমানবন্দর ঘিরে ব্যবসায়ী মহলেও রয়েছে আগ্রহ। বিমানবন্দর-সংলগ্ন কুমিল্লা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল—কুমিল্লা ইপিজেডে বর্তমানে দেশি-বিদেশি ৪৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পণ্য উৎপাদন করছে। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কুমিল্লা ইপিজেড থেকে ৯০২ দশমিক ২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, কুমিল্লা বিমানবন্দর চালু হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সরাসরি এ অঞ্চলে যাতায়াত সহজ হবে। এতে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার পাশাপাশি শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।
এ বিষয়ে কুমিল্লা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ডা. আজম খান নোমান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কুমিল্লায় বিমানবন্দর পুনরায় চালু করা সময়ের দাবি। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের প্রতি অনুরোধ থাকবে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার।
৩২ বছর ধরে নেই যাত্রীবাহী ফ্লাইট
কুমিল্লা বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নেউরা-ঢুলিপাড়ার পাশে বিমানবন্দরটি স্থাপন করা হয়। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে সেনাবাহিনী এ বিমানবন্দর ব্যবহার করত। একই বছর বন্দরটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
১৯৭৬ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর এখানে বিমান ওঠানামা করে। পরে যাত্রীসংকটে ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯৪ সালে ফের বিমানবন্দরটি চালু করা হলেও পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়ায় মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে এয়ারলাইন্সগুলো বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এরপর গত ৩২ বছর ধরে এখানে কোনো যাত্রীবাহী বিমান ওঠানামা করেনি।
তবে বিমানবন্দরটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ নেই। বর্তমানে ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করছেন। বিমানবন্দরটি প্রায় ৭৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
আকাশপথে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কুমিল্লা
যাত্রীবাহী বিমান চলাচল বন্ধ থাকলেও কুমিল্লা বিমানবন্দরের ডিভিওআর ও ডিএমই সিগন্যাল এখনো সচল রয়েছে। এসব নেভিগেশনাল সিগন্যাল ব্যবহার করে ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের বিমান আন্তর্জাতিক আকাশপথে চলাচল করে।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি বিমান কুমিল্লা বিমানবন্দরের নেভিগেশন সিগন্যাল ব্যবহার করে। এর মধ্যে ভারতের অভ্যন্তরীণ রুটের বিমান, আগরতলাগামী উড়োজাহাজ ছাড়াও ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুর রুটের বিমান রয়েছে।
বিমান ওঠানামা না করেও ডিভিওআর ও ডিএমই সিগন্যাল ব্যবহারের মাধ্যমে সরকার প্রতি মাসে প্রায় আড়াই কোটি টাকা রাজস্ব আয় করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কুমিল্লা বিমানবন্দরের সিএনএস প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন আহমদ বলেন, বিমানবন্দরটি সরকারের একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের দৈনিক ২৫-৩০টি বিমান আমাদের ডিভিওআর ও ডিএমই সিগন্যাল ব্যবহার করে। এটি একটি আন্তর্জাতিক বিমান রুট। এর মাধ্যমে প্রতিবছর সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আসে। বর্তমানে আমরা ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী তিন শিফটে এখানে কাজ করছি। বর্তমানে বিমানবন্দরে নেভিগেশনাল যন্ত্রের আপডেট কাজ চলছে।তিনি আরও বলেন, বিমানবন্দরটি নতুন করে চালু করতে হলে রানওয়ের কার্পেটিং, ফায়ার ব্রিগেড, এয়ারক্রাফটের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য টাওয়ারে ভিএইচএফ সেট করা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। এগুলো হলেই বিমানবন্দর দিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলে আর বাধা থাকবে না। তবে সমস্যা হলো, নীতিমালার তোয়াক্কা না করেই বিমানবন্দরের চারপাশে বহু ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। অনেকেই এখনো নির্মাণ করছেন। আগামীতে যেন বিমানবন্দর এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে কোনো আবাসিক ভবন নির্মাণ না করতে পারে, আমরা সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখেছি।
আরও পড়ুন-
https://risingcumilla.com/%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%9F%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%B8%E0%A7%87-%E0%A6%86%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%93-%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0/
রানওয়ে সংস্কারেই কি ফিরতে পারে বিমান?
সরেজমিনে বিমানবন্দর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একসময় ব্যস্ত থাকা স্থাপনাটিতে এখন অনেকটাই নীরব পরিবেশ। বিভিন্ন জায়গায় গরুর ঘাস চাষ করা হয়েছে। রয়েছে ছোট ছোট পুকুরও। রানওয়ের পিচ উঠে কোথাও কোথাও পাথরের কণা বের হয়ে এসেছে এবং আগাছা জন্মেছে।
এ ছাড়া উড়োজাহাজের টেক-অফ ও ল্যান্ডিংয়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছে একাধিক আবাসিক ভবন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যতে বিমান চলাচল শুরু করতে হলে বিমানবন্দরের চারপাশের স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ও উড্ডয়ন-অবতরণ সংক্রান্ত বিধিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন করে বিমানবন্দর চালু করতে বড় ধরনের ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। মূলত রানওয়ে কার্পেটিং, ফায়ার সার্ভিসের ব্যবস্থা, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারে প্রয়োজনীয় জনবল ও এয়ারক্রাফটের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ভিএইচএফ সেটসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হলেই অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট চালুর পথ তৈরি হতে পারে।
আট আঞ্চলিক বিমানবন্দর চালুর পরিকল্পনা
দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটন সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে আটটি আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুনরায় চালুর মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এ তালিকায় কুমিল্লা বিমানবন্দরের নামও রয়েছে বলে জানা গেছে।
বাকি বিমানবন্দরগুলো হলো—বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, ঈশ্বরদী, শমশেরনগর, খানজাহান আলী ও পটুয়াখালী বিমানবন্দর।
বন্ধ বিমানবন্দর চালুর বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো পুনরায় চালুর একটি প্রস্তাব ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
শুধু কুমিল্লা নয়, উপকৃত হবে পুরো অঞ্চল
স্থানীয়দের দাবি, কুমিল্লা বিমানবন্দর চালু হলে এর সুফল শুধু কুমিল্লার মানুষই পাবেন না; চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি বড় অংশের মানুষও এর সুবিধা নিতে পারবেন। বিশেষ করে প্রবাসী কর্মী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের জন্য এটি একটি কার্যকর আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করতে পারে।
ফেনীর বাসিন্দারা মনে করছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিমান যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হলে জরুরি ও ব্যবসায়িক যাতায়াতে নতুন বিকল্প তৈরি হবে।
চাঁদপুরের বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, কুমিল্লার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যবহার করে বিমানবন্দরটি চালু হলে জেলার প্রবাসী পরিবারগুলো সহজেই বিমানযাত্রার সুযোগ পাবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দারাও কুমিল্লা বিমানবন্দরকে বৃহত্তর অঞ্চলের একটি আঞ্চলিক বিমান হাব হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিমানবন্দর চালু হলে প্রবাসী যাত্রীদের পাশাপাশি কুমিল্লা ইপিজেডের ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই দীর্ঘ ৩২ বছর পর কুমিল্লা বিমানবন্দরে আবারও যাত্রীবাহী বিমান নামবে—এ প্রত্যাশা এখন কুমিল্লাসহ আশপাশের কয়েক জেলার মানুষের।
সম্পাদক : শাদমান আল আরবী | নির্বাহী সম্পাদক : তানভীর আল আরবী
ঠিকানা : ঝাউতলা, ১ম কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০। ফোন : ০১৩১৬১৮৬৯৪০, ই-মেইল : [email protected], বিজ্ঞাপন: [email protected], নিউজরুম: [email protected] © ২০২৩ রাইজিং কুমিল্লা সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত। | Design & Developed by BDIGITIC