
লেখক: নাজাফ উদ্দিন ইমন

শালবন বিহারে দাঁড়ালে মনে হয় সময় যেন থমকে গেছে। লাল ইটের ভাঙা দেয়ালে সূর্যের আলো পড়লে সেখানে কেবল স্থাপত্য নয়, জেগে ওঠে এক প্রাচীন সভ্যতার স্মৃতি। নীরব টিলার উপর ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই ভূমি একসময় ছিল জ্ঞান, সাধনা ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
কুমিল্লার লালমাই ও ময়নামতি পাহাড়শ্রেণী দীর্ঘদিন ইতিহাসের আড়ালে ছিল। ১৮৭৫ সালে কোটবাড়ি এলাকায় সড়ক নির্মাণকাজ চলাকালে হঠাৎ একটি প্রাচীন স্থাপনার অবশিষ্টাংশ আবিষ্কৃত হয়। প্রথমে একে দুর্গ বলে ধারণা করা হলেও পরে গবেষণায় প্রমাণিত হয়, এটি ছিল বিহারকেন্দ্রিক একটি নগর কাঠামোর অংশ। ১৯১৭ সালে নলিনীকান্ত ভট্টশালী এই স্থাপনাগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবু দীর্ঘ সময় পর্যন্ত যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণা সীমিত পর্যায়েই ছিল।
পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনা নির্মাণের সময় আবার বহু প্রত্ননিদর্শন উন্মোচিত হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সচেতনতার অভাবে কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রাগৈতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বসতির ধারাবাহিকতা
লালমাই ও ময়নামতি অঞ্চল শুধু মধ্যযুগীয় নিদর্শনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, প্রাগৈতিহাসিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে শিলীভূত কাঠ ও প্রস্তরযুগীয় হাতিয়ার পাওয়া গেছে, যা বহু সহস্র বছর আগে মানব উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। যদিও পর্যাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এখনও সীমিত, তবুও ধারণা করা হয় যে নব্য প্রস্তর যুগ থেকেই এই এলাকায় মানব বসতি গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে গুপ্তযুগ থেকে ধারাবাহিকভাবে এখানে জনবসতির প্রমাণ পাওয়া যায়।
নদীপথ, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক সংযোগ
প্রাচীন মানচিত্র ও ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায়, একসময় মেঘনা নদীর একটি শাখা ময়নামতির পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো এবং সমুদ্রপথের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে এই অঞ্চল ছিল নৌবাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্থলপথ ও জলপথ উভয় দিক থেকেই এটি বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ত্রিপুরা অঞ্চলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের কারণে এ অঞ্চল একসময় আঞ্চলিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। রাজনৈতিক সীমানা পরিবর্তনের আগে এটি ছিল বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ভূখণ্ডের অংশ।
প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব
১৯৫৫ সালে আনুষ্ঠানিক খননকার্য শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে বহু প্রাচীন বিহারের অবশেষ। শালবনমুড়া, কোটিলা মুড়া, আনন্দবিহারসহ বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত খননে স্পষ্ট হয় যে এই অঞ্চল ছিল একাধিক বিহারের সমষ্টি।
এই বিহারগুলো কেবল ধর্মীয় উপাসনালয় ছিল না, বরং তৎকালীন শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। সপ্তম ও অষ্টম শতকে ভিক্ষুরা আবাসিকভাবে এখানে অবস্থান করে ধর্ম, দর্শন ও জ্ঞানচর্চা করতেন। বহু কক্ষবিশিষ্ট পরিকল্পিত স্থাপত্যরূপ প্রমাণ করে যে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক চর্চা এখানে সুসংগঠিত ছিল।
[caption id="attachment_56426" align="alignnone" width="1200"]
লেখক[/caption]
শালবন বিহারের স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য
অষ্টম শতকে দেববংশীয় রাজা ভবদেবের আমলে শালবন বিহার নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। চতুষ্কোণ এই স্থাপনার প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬৮ মিটার। কেন্দ্রস্থলে একটি বৃহৎ মন্দির এবং চারপাশে ১১৫টি আবাসিক কক্ষ ছিল। এছাড়াও বিভিন্ন স্তুপ ও উপমন্দিরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।
একসময় এটি সমতট অঞ্চলের ধর্মীয় ও বৌদ্ধিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র ছিল। দূরদূরান্ত থেকে আগত সাধক ও শিক্ষার্থীরা এখানে সমবেত হতেন। ফলে এটি একটি আঞ্চলিক নয়, বরং বিস্তৃত প্রভাবসম্পন্ন জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন
একটি জাতি তার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে নিজের পরিচয় নির্মাণ করে। তাই প্রত্নস্থানের গুরুত্ব কেবল অতীতচর্চায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন করে তোলার মাধ্যমও। এসব স্থানকে পাঠ্যপুস্তক ও গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কৌতূহল ও আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে।
সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে যায়, কিন্তু ইতিহাস কখনো সম্পূর্ণ বিলীন হয় না। কখনো তা মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকে, আবার কোনো এক সময়ে নতুন আলোয় ফিরে আসে। আমাদের দায়িত্ব সেই নিদর্শনগুলোকে সংরক্ষণ করা, গবেষণা করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।
শালবন বিহার তাই শুধু একটি প্রত্নস্থান নয়, এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রতিচ্ছবি। নিজের শিকড়কে জানা এবং সংরক্ষণ করাই একটি সচেতন জাতির পরিচয়।
মো. নাজাফ উদ্দিন ইমন
লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
সম্পাদক : শাদমান আল আরবী | নির্বাহী সম্পাদক : তানভীর আল আরবী
ঠিকানা : ঝাউতলা, ১ম কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০। ফোন : ০১৩১৬১৮৬৯৪০, ই-মেইল : [email protected], বিজ্ঞাপন: [email protected], নিউজরুম: [email protected] © ২০২৩ রাইজিং কুমিল্লা সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত। | Design & Developed by BDIGITIC