সোমবার ১ ডিসেম্বর, ২০২৫

কুমিল্লায় চুরির অভিযোগে রাজনৈতিক সংঘাত, বিএনপি-এলডিপি দ্বন্দ্বে আহত অন্তত ৫০

ওসমান গনি, চান্দিনা প্রতিনিধি

কুমিল্লায় চুরির অভিযোগে রাজনৈতিক সংঘাত, বিএনপি-এলডিপি দ্বন্দ্বে আহত অন্তত ৫০/ছবি: প্রতিনিধি

কুমিল্লার চান্দিনার চলোড়া বাজারে এক নগণ্য চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ছড়িয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং এলডিপির নেতা কর্মীদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ বাধে।

শনিবার (২৯ নভেম্বর )রাতে শুরু হওয়া এই দ্বন্দ্বে উভয় পক্ষের অন্তত ৫০ জন কর্মী আহত হয়েছেন। গুরুতর আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এলাকায় বর্তমানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং যেকোনো ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

এ সময় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-এর অঙ্গ সংগঠন গণতান্ত্রিক যুবদল বাড়েরা ইউনিয়ন শাখার সহ-সভাপতি মো. ফখরুল ইসলামকে কুপিয়ে জখম করে বিএনপি নেতাকর্মীরা। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে চান্দিনা সরকারি হাসপাতাল থেকে ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে।

এছাড়াও ওই ঘটনায় উভয় পক্ষের আরও কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়েছেন, তবে তাদের মধ্যে কেউ গুরুতর নন। সংঘর্ষের সময় ১টি মোটরসাইকেল জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং ৪টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। রবিবার (৩০ নভেম্বর) বেলা ২টা থেকে প্রায় ৪টা পর্যন্ত দফায় দফায় এই সংঘর্ষ ঘটে।

খবর পেয়ে চান্দিনা থানা পুলিশ ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে হামলাকারীরা পুলিশের উপরও হামলা চালায়। পরে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। ততক্ষণে বাড়েরা ইউনিয়ন গণতান্ত্রিক স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সভাপতি ছোটনের খাবার হোটেল এবং গণতান্ত্রিক যুবদল বাড়েরা ইউনিয়ন শাখার সহ-সভাপতি মো. ফখরুল ইসলামের ভাই হোসাইনের একটি চায়ের দোকান ভাঙচুর করে প্রতিপক্ষ বিএনপি’র লোকজন। ছোটনের খাবার হোটেল থেকে নগদ ৪০ হাজার টাকা লুটপাট ও তার বসত বাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী বাড়েরা ইউনিয়ন গণতান্ত্রিক স্বেচ্ছাসেবক দল সহ-সভাপতি ছোটন জানান, চিলোড়া বাজার জামে মসজিদের উন্নয়নের জন্য দান অনুদানের টাকা সবসময় গণতান্ত্রিক যুবদল উপজেলা বাড়েরা ইউনিয়ন শাখার সহ-সভাপতি মো. ফখরুল ইসলামের মুদি দোকানে রাখা হয়। গত শনিবার (২৯ নভেম্বর) দিনগত রাত আড়াইটায় দোকানের শাটারের তালা ভেঙে চুরির ঘটনা ঘটে। সিসি ক্যামেরা যাচাই করে দেখা যায়, পার্শ্ববর্তী এতবারপুর গ্রামের মৎস্যজীবী দল নেতা রোকনের ছেলে রিফাত (১৫) ওই চুরির ঘটনা ঘটায়। পরদিন রবিবার (৩০ নভেম্বর) দুপুরে অভিযুক্ত রিফাতকে চিলোড়া বাজারে পেয়ে আটক করা হয় এবং উত্তেজিত জনতা তাকে মারধর করে মাথা ন্যাড়া করে দেয়।

ওই ঘটনার জের ধরে রিফাতের গ্রাম এতবারপুর, পৌরসভার হারং ও মহারং এলাকার বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা গণতান্ত্রিক যুবদল উপজেলা বাড়েরা ইউনিয়ন শাখার সহ-সভাপতি মো. ফখরুল ইসলামের বসত বাড়িতে হামলা করে তাকে বেদম মারধর ও কুপিয়ে জখম করে। এ সময় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাদের মারধর ও দোকান ভাঙচুর করে বিএনপি নেতাকর্মীরা। তিনি অভিযোগ করেন, চান্দিনা পৌর যুবদল আহ্বায়ক হাজী নূরু, পৌর ছাত্রদল আহ্বায়ক দোলন, এতবারপুর ইউনিয়ন বিএনপি’র সহ-সভাপতি মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে ওই হামলা চালানো হয়।

অভিযুক্ত চান্দিনা পৌর যুবদল আহ্বায়ক হাজী নূরুল ইসলাম মুন্সী বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, “আমার মা অসুস্থ থাকায় আমি সারাদিন কুমিল্লাতে আছি। এ ঘটনা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।”

উপজেলা এলডিপি’র সভাপতি একেএম শামসুল হক মাস্টার বলেন, “বিএনপি সম্প্রতি সারাদেশে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে, কিন্তু কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনে কোনো প্রার্থী দেয়নি। যুগপৎ আন্দোলনে আমরা বিএনপি’র সাথে স্বৈরাচার বিরোধী সকল আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছি। ফলে এই আসনে আমাদের দলের মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ-এর মনোনয়ন প্রাপ্তির সম্ভাবনা দেখা দিলে উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি শাওন ও তার লোকজন ইচ্ছাকৃতভাবে এলডিপি’র নেতাকর্মীদের সাথে ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। আমরা সবসময় সংঘর্ষ এড়িয়ে চলতে চাই। তবে, আমাদের অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছে। তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর লুটপাট হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনী ব্যবস্থা প্রত্যাশা করছি।”

উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক কাজী আরশাদ বলেন, “সন্দেহজনকভাবে ১৫ বছরের একটি ছেলেকে মারধর করার খবর পেয়ে আমাদের কিছু নেতাকর্মী ঘটনাস্থলে গেলে প্রতিপক্ষের লোকজন আমাদের ৪-৫ জন নেতাকর্মীকে মারধর করে। এতবারপুর ইউনিয়ন বিএনপি’র সহ-সভাপতি মিজানুর রহমান ঘটনাস্থলে যায়নি বলে তিনি দাবি করেন। এছাড়া ৫টি মোটরসাইকেল জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।”

এ ব্যাপারে চান্দিনা থানা অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) জাবেদ উল ইসলাম রবিবার সন্ধ্যায় জানান, চুরির ঘটনা থেকেই বিষয়টি রাজনৈতিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। ঘটনার পর পুলিশ ও সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরও পড়ুন