
মোঃ রায়হানুল বারি রাসেল
ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলার আকাশ-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এক বিশেষ আনন্দ ও উচ্ছ্বাস। সিয়াম সাধনার একমাস শেষে আসে পবিত্র ঈদের আনন্দবার্তা। “ঈদ মোবারক” শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি শোনা যায় আরেকটি চিরচেনা আহ্বান—“সালামি দেন!” ছোট্ট এই আবদারের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাঙালির ঈদ উদযাপনের এক প্রাণবন্ত ও আবেগঘন সংস্কৃতি- ঈদ সালামি।
ঈদ সালামির এই রীতির শিকড় নিহিত রয়েছে ধর্মীয় ও সামাজিক চর্চার গভীরে। ইসলামে সালাম বিনিময় শান্তি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। ছোটদের বড়দের সালাম দেওয়া কেবল একটি সামাজিক রীতি নয়, এটি আদব-কায়দার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই সালামের বিনিময়ে বড়দের পক্ষ থেকে ছোটদের কিছু উপহার দেওয়ার যে চর্চা, তা সময়ের প্রবাহে “ঈদ সালামি” নামে পরিচিতি লাভ করেছে। ফলে সালামি শুধুমাত্র অর্থের বিনিময় নয়—এটি হয়ে উঠেছে ভালোবাসা, আশীর্বাদ এবং পারিবারিক বন্ধনের প্রতীক।
চাঁদ রাত থেকেই শুরু হয় শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস আর পরিকল্পনা। কে কার কাছে আগে যাবে, কার কাছ থেকে কত পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, কিংবা কার সঙ্গে দল বেঁধে গেলে ‘না’ বলা কঠিন হবে—এইসব হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তারা। শিশুকিশোরদের জন্য ঈদের আনন্দের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকে এই সালামি পাওয়ার প্রত্যাশা। ঈদের সকাল, নামাজ শেষে, নতুন পোশাক পরে যখন ছোটরা বড়দের সামনে গিয়ে সালাম করে—তখন সেই দৃশ্য হয়ে ওঠে অত্যন্ত আবেগঘন ও প্রাণবন্ত।
অন্যদিকে বড়দের মাঝেও কম আনন্দ দেখা যায় না। তারা প্রায়ই মজার ছলে শর্ত জুড়ে দেন—“আগে ভালো করে সালাম দাও, তারপর সালামি”, “তিনবার সালাম করলে বেশি পাবে”, কিংবা “পা ধরে সালাম করলে দ্বিগুণ”—এইসব হাস্যরসাত্মক কথোপকথনে ভরে ওঠে পারিবারিক পরিবেশ। এই মুহূর্তগুলো কেবল আনন্দই দেয় না, বরং পরিবারে আন্তরিকতা ও উষ্ণতা আরও গভীর করে।
সালামির পরিমাণ কখনোই এই রীতির মূল আকর্ষণ ছিল না; বরং এর প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত আবেগ ও স্মৃতির ভেতর। দাদার কাঁপা হাতে দেওয়া সামান্য কিছু টাকা, নানির আঁচল থেকে বের করা ছোট্ট উপহার—এসব মুহূর্ত জীবনের সঙ্গে মিশে থাকে দীর্ঘদিন। বড় হয়ে যাওয়ার পরও মানুষ যখন বলে, “দাদু প্রতি ঈদে দশ টাকা দিতেন”, তখন সেই কথার ভেতরেই জেগে ওঠে শৈশবের অমলিন স্মৃতি ও ভালোবাসা।
ঈদ সালামির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি প্রজন্মের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনে। আধুনিক ব্যস্ত জীবনে যেখানে পারিবারিক যোগাযোগ অনেক সময় সীমিত হয়ে যায়, সেখানে ঈদের দিন এই ছোট্ট রীতিটি পরিবারের সদস্যদের আরও কাছে নিয়ে আসে। দাদা-নাতি, চাচা-ভাতিজা কিংবা বড় ভাই-ছোট ভাই—সবাই যেন এই এক উপলক্ষে একটি আবেগের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। শহর কিংবা গ্রাম—সব জায়গাতেই এই দৃশ্য একইরকম হৃদয়স্পর্শী।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই রীতির কিছু পরিবর্তনও এসেছে। ডিজিটাল যুগে মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ট্রান্সফার কিংবা ভিডিও কলের মাধ্যমে সালামি দেওয়া-নেওয়া এখন সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “সালামি পাঠান” লেখা মজার মিম কিংবা স্ট্যাটাসও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসী স্বজনদের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি দূরত্ব কমিয়ে এনে সালামির আনন্দকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এই সংস্কৃতি এক নতুন মাত্রা পেয়েছে—জুনিয়ররা পরিচিত সিনিয়রদের ইনবক্সে সালাম জানিয়ে সালামির আবদার করে, যা সম্পর্ককে আরও আন্তরিক করে তোলে।তবে মাধ্যম বদলালেও এর অন্তর্নিহিত অনুভূতি—ভালোবাসা ও স্নেহ—অপরিবর্তিত রয়েছে।
ঈদ সালামি তাই কেবল একটি উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি বাঙালির সংস্কৃতি, পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক ঐক্যের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। এটি শেখায় সম্মান, ভালোবাসা এবং ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ। ছোটদের জন্য এটি যেমন আনন্দের, তেমনি বড়দের জন্য এটি স্নেহ প্রকাশের এক সহজ ও সুন্দর উপায়।
যতদিন বাংলার আকাশে ঈদের চাঁদ উঠবে, ততদিন এই রীতি বেঁচে থাকবে মানুষের হৃদয়ে। প্রজন্ম বদলাবে, সময় বদলাবে, কিন্তু ছোট্ট কণ্ঠে ভেসে আসা সেই চিরচেনা আবদার— “সালামি দেন!”-কখনো হারিয়ে যাবে না।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
সম্পাদকীয় পর্ষদ সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
সম্পাদক : শাদমান আল আরবী | নির্বাহী সম্পাদক : তানভীর আল আরবী
ঠিকানা : ঝাউতলা, ১ম কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০। ফোন : ০১৩১৬১৮৬৯৪০, ই-মেইল : [email protected], বিজ্ঞাপন: [email protected], নিউজরুম: [email protected] © ২০২৩ রাইজিং কুমিল্লা সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত। | Design & Developed by BDIGITIC