
পবিত্র রমজান মাস সংযম, আত্মত্যাগ ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক অনন্য নিদর্শন। এ মাসজুড়ে ইফতারকে ঘিরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) ক্যাম্পাসে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর এক আবহ, সৃষ্টি হয়েছে সম্প্রীতির অনন্য বার্তা। প্রতিদিন বিকালে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন খেলার মাঠ, শহিদ মিনার ও উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে খোলা আকাশের নিচে দেখা যায় ভিন্নধর্মী ও আকর্ষণীয় সব ইফতার আয়োজনের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।
হল থেকে বন্ধু ও পরিচিতদের নিয়ে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত স্থানে একত্রিত হয় এবং নিজ নিজ পছন্দমতো নানা পদের ইফতার সাজিয়ে তোলে। খেজুর, ফলমূল, ছোলা, পিয়াজুসহ বিভিন্ন ঘরোয়া ও সুস্বাদু খাবারে প্রতিটি আয়োজন হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে সবাই অংশ নেয় এই মিলনমেলায়; ফলে ইফতার শুধু আহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা পরিণত হয় সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও আন্তরিকতার এক সুন্দর বহিঃপ্রকাশে। সবুজ ঘাসের ওপর গোল হয়ে বসে ইফতারের প্রস্তুতির পাশাপাশি চলে গল্প-আড্ডা ও পারস্পরিক কুশল বিনিময়, যা পুরো পরিবেশকে আরও উষ্ণ ও আনন্দমুখর করে তোলে।
এই ইফতার আয়োজনে নেই কোনো ভেদাভেদ বা শ্রেণিগত বিভাজন। হলের বন্ধু-বান্ধব, সিনিয়র-জুনিয়র এমনকি প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন এ আনন্দঘন মিলনমেলায়। সবচেয়ে বেশি সমাগম দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, বেটমিন্টন মাঠ ও শহীদ মিনার। পাশাপাশি হলগুলোর ছাদ ও বিভিন্ন বিভাগের কক্ষেও শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইফতারের আয়োজন করে থাকে, যা পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে সৃষ্টি করে এক প্রাণবন্ত ও সম্প্রীতির আবহ।
গত বছরের ন্যায় এবারও অর্ধেক রমজান পর্যন্ত চালু থাকবে কুবির ক্লাস-পরীক্ষা। ক্লাস-পরীক্ষার কারণে রোজার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের থাকতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বা মেসগুলোতে। পরিবারের সঙ্গে থাকলে মায়ের হাতের বাহারি আয়োজনে জমে উঠতো ইফতার। কিন্তু ক্যাম্পাসে অবস্থান করায় বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গেই ইফতার করতে হচ্ছে। এর মধ্যে থাকে বিভিন্ন বিভাগ ও ব্যাচের পক্ষ থেকে আয়োজিত ইফতার, থাকে জেলা ভিত্তিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সাংবাদিক সংগঠনসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত ইফতার।
মাঠে ইফতার করতে আসা একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস্ বিভাগের শিক্ষার্থী ইসতিয়াক আহমেদ পিয়াল জানান, ব্যাচমেট,সিনিয়র, জুনিয়র—সবাই একসাথে বসে ইফতার করাটা সত্যিই অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করে সব সময়। ধর্ম বা পরিচয়ের বাধা ছাড়াই সবাই মিলে ভাগ করে নেওয়ার এই আয়োজন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। প্রতি বছর আমরা এই মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষায় থাকি।
অনিত দাশ নামের সনাতন ধর্মের এক শিক্ষার্থী জানান, আমি সনাতন ধর্মের শিক্ষার্থী হলেও রমজান মাসে বন্ধু ও সিনিয়রদের সঙ্গে খোলা আকাশের নিচে ইফতার করা আমার কাছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। সবার একসাথে প্রার্থনা করা, আর পরস্পরের মাঝে খাবার ভাগাভাগি—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ভিন্ন ধর্মের হয়েও আমরা যে ভালোবাসা, সম্মান ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারি, এই ইফতার মুহূর্তগুলো তারই সুন্দর প্রমাণ।








