মার্চ ২৮, ২০২৫

শুক্রবার ২৮ মার্চ, ২০২৫

আলুর কেজি ৮ টাকা!

Rising Cumilla - potatoes
ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহীতে আলুর দামে আরেকদফা ধস নেমেছে। গত তিন দিনে, কৃষকেরা মাঠে প্রতি কেজি আলু ৮-৯ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষকদের মতে, গত ৩০ বছরে এমন বিপর্যয় তারা দেখেননি। লাভের বদলে ক্ষতির মুখে পড়ে, অনেক কৃষক আলু বিক্রি করতে না পেরে ভাগাড়ে ফেলে দিচ্ছেন বা খোলা মাঠে রেখে দিচ্ছেন। কেউ কেউ তো জমি থেকে আলু তোলাও বন্ধ করে দিয়েছেন।

কৃষকদের দাবি, শ্রমিক খরচও উঠছে না আলু বিক্রি করে। হিমাগার মালিক ও মজুতদারদের কারসাজিতে আলুর এই অস্বাভাবিক দরপতন হয়েছে।

আলু চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার জেলায় আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু দাম না থাকায়, কৃষকেরা জমি ইজারার খরচও তুলতে পারছেন না। হিমাগারের অগ্রিম বুকিং থাকা সত্ত্বেও, অনেক কৃষক আলু রাখতে পারছেন না। এর পেছনে রাজনৈতিক সিন্ডিকেটও কাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেকে অগ্রিম বুকিং ছাড়াই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জোর করে আলু হিমাগারে ঢোকাচ্ছেন। ফলে, অসহায় কৃষকদের আলু জমিতেই পড়ে থাকছে।

তানোর উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের আলু চাষি রফিকুল ইসলাম জানান, ফেব্রুয়ারির শেষে আলু তোলা শুরু হলে, প্রথমে দাম ১২-১৩ টাকা কেজি ছিল। কিন্তু এখন তা ৮-৯ টাকায় নেমে এসেছে। তার বিঘাপ্রতি জমিতে ৬৯ মণ আলু হয়েছে। কিন্তু এক বিঘা জমির আলু বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২৪-২৫ হাজার টাকা।

রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, “প্রতি বিঘা আলুর জমি ইজারা নিয়েছিলাম ২৭ হাজার টাকায়। বীজ, শ্রমিক খরচ, সেচ, সার, কীটনাশক ও পরিবহন খরচ বাবদ আরও ৩৫ হাজার টাকা লেগেছে। প্রতি বিঘায় এবার ৩৮ হাজার টাকা লোকসান হবে।”

মোহনপুরের বসন্তকেদার গ্রামের চাষি মাজহারুল ইসলাম জানান, “হিমাগারে অগ্রিম বুকিং দেওয়ার পরও আলু রাখতে পারিনি। হিমাগার মালিক বলেছেন, আলু নেওয়া যাবে না। আমাদের বুকিংগুলো কেটে দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদেরকে দেওয়া হচ্ছে। তাই, আলু জমিতেই শুকাচ্ছি।”

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে ৩৭ হাজার ৩৭৮ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু আবাদ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে। ধারণা করা হচ্ছে, জেলায় ১১ লাখ টন আলু উৎপাদন হবে। রাজশাহীর ৩৬টি হিমাগারের ধারণ ক্ষমতা চার লাখ টন। অর্থাৎ, প্রায় ৭ লাখ টন আলু সংরক্ষণের বাইরে থেকে যাবে।

তানোরের আড়াদিঘি গ্রামের চাষি মজিবুর রহমান জানান, “৪০ বিঘা জমিতে ৭ হাজার বস্তা আলু হয়েছে। রহমান কোল্ড স্টোরেজে অগ্রিম বুকিং দিয়েছিলাম। এখন অর্ধেক আলু তোলার পর আর আলু নিচ্ছে না ম্যানেজার। গত এক সপ্তাহ ধরে আলু জমিতেই পড়ে আছে।”

তার অভিযোগ, দলীয় প্রভাব খাটিয়ে একটি সিন্ডিকেট বুকিং ছাড়াই জোর করে আলু হিমাগারে দিচ্ছে। দলীয় সিন্ডিকেট আলু রাখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য কৃষকদের কাছ থেকে মোটা টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

রহমান কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার আব্দুল মুনিম বলেন, “দলীয় লোকেরা এসে কিছু আলু রাখতে চাচ্ছেন। আমরাও তাদের না করতে পারছি না। তবে সেটার পরিমাণ বেশি না। এবার রাজশাহীতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আলু হয়েছে। তাই, হিমাগারে জায়গা হচ্ছে না।”

মোহনপুরের জাহানাবাদ এলাকার চাষি জাহিদুল করিম বলেন, “আমরা কৃষক সবদিকেই ক্ষতিগ্রস্ত। এবার ফলন হয়েছে, কিন্তু লাভ হলো না। কোল্ড স্টোরেজে জায়গাও পাচ্ছি না। গত বছর কেজি প্রতি কোল্ড স্টোরেজ ভাড়া ছিল ৪ টাকা। এবার সেটি ৮ টাকা হয়েছে। এ বিপুল লোকসান কাটিয়ে ওঠা কঠিন।”

আলুর দরপতন নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোতালেব হোসেন জানান, “এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আলুর উৎপাদন ভালো হয়েছে। তবে সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেছে। ফলে আলুর দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে।”