
লেখক: মোঃ রায়হানুল বারি রাসেল
নামটা উচ্চারণ করলেই বুকের ভেতর একটা ঢেউ ওঠে—শরীফ ওসমান হাদী। এই নাম কোনো পোস্টারের ছাপা অক্ষর নয়, কোনো স্লোগানের অলংকৃত ফন্টও না। এই নামটা এই সময়ের এক জীবন্ত উচ্চারণ জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা আর সার্বভৌমত্বের প্রতীক। যে প্রতীক হাঁটে মানুষের ভিড়ে, কথা বলে মানুষের ভাষায়, আর ঠিক সেই জায়গাতেই দাঁড়ায়—যেখানে মানুষের সবচেয়ে বেশি দরকার হয়। প্রয়োজনে বুলেটের মুখোমুখি হয়েও।
আজ হাদী হাসপাতালের বিছানায়। শরীরে গুলির ক্ষত, চারপাশে সাদা আলো, নিরবচ্ছিন্ন মনিটরের শব্দ। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই চিরচেনা নীরব লড়াই। কিন্তু এই দেশ জানে—হাদী কখনোই শুধু একটি শরীর ছিল না। হাদী একটি বিশ্বাস। আর বিশ্বাসকে গুলি করে মেরে ফেলা যায় না। বিশ্বাস আহত হতে পারে, রক্তাক্ত হতে পারে, কিন্তু নিঃশেষ হয় না।
এই ভূখণ্ড বহুবার দেখেছে—যখনই অন্যায় শক্ত হয়, যখনই অত্যাচার নিজেকে রাষ্ট্রের নাম দিয়ে বৈধ করতে চায়, তখনই কোথাও না কোথাও একজন হাদী উঠে দাঁড়ায়। কখনো সে ছাত্র, কখনো শ্রমিক, কখনো সাংবাদিক, কখনো একেবারে সাধারণ একজন মানুষ। মসজিদের মিনার আকাশে মাথা তোলে শুদ্ধতার প্রতীক হয়ে। হাদী ঠিক সেই মিনারের মতো—ভোর-সন্ধ্যায় ঢেউ তোলে, ভয়কে ভেঙে দেয়, আত্মসমর্পণের সংস্কৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আমরা জানি, রক্তেই ধুয়ে যায় কলঙ্ক। ইতিহাস বারবার তা প্রমাণ করেছে। শহিদের জমিনে জন্ম নেয় ইনসাফের স্বপ্ন, ন্যায়ের বীজ। আজ হাদীর যে রক্ত ঝরেছে, তা অপবিত্র নয়—তা পবিত্র। এই রক্ত কোনো প্রতিশোধ চায় না, কোনো হিংসার দাবিদার নয়। এই রক্ত চায় ন্যায়। চায় মানুষের অধিকার। চায় এমন একটি দেশ, যেখানে ফ্যাসিবাদ আর ফিরে আসতে না পারে। যেখানে লাল-সবুজ কেবল পতাকার রং নয়, বরং মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা আর বাক্স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি।
কিন্তু এই পথ সহজ নয়। ন্যায়, নীতি আর ইনসাফের প্রশ্নে সবসময়ই থাকে অগণিত বাধা—অন্ধকারাচ্ছন্ন, কূটচালপূর্ণ, ভয়ংকর। থাকে ভয়ের রাজনীতি, থাকে সুবিধাবাদের কোলাহল। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম থাকে না। তাদের জন্য কোনো স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে ওঠে না। থাকে হাদীদের নাম—যারা অন্ধকারে আলো জ্বালায়, নিজের শরীর দিয়ে সময়কে প্রশ্ন করে, প্রজন্মকে সাহস ধার দেয়।
আজ সেই অন্ধকারে হাদী নিজেই এক বাতি। গুলিবিদ্ধ শরীর নিয়েও সে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বিবেকের সামনে। আমাদের দিকে তাকিয়ে নীরবে প্রশ্ন রাখছে—আমরা কি চুপ থাকব? নাকি মানুষের জয়গান ধরব? আমরা কি কেবল মিছিলের ছবি তুলব, স্ট্যাটাস লিখে দায়িত্ব শেষ করব? নাকি সত্যিই দায়িত্ব নেব মানুষের জীবনের, মানুষের ভবিষ্যতের?
এই কলাম কোনো আহ্বান নয়, কোনো হুমকিও নয়। এটি একটি দোয়া। একটি সমবেত মিনতি। খোদা, হাদীকে ফেরত দাও। শুধু একজন মানুষকে নয় ফেরত দাও একটি যুগকে, একটি সাহসকে, একটি স্বপ্নকে। এমন এক স্বপ্ন, যেখানে মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচতে চায়।
আজ বড় দরকার তার তেজ। দরকার তার শান্ত কিন্তু সাহসী কণ্ঠ, তার দৃঢ় চোখের ভাষা। ষোলো কোটি মানুষের হাহাকার সে শুনুক। এই দেশের মানুষ এখনো নত হয়নি, এখনো বিক্রি হয়নি। তারা ক্লান্ত, আহত, কিন্তু পরাজিত নয়। তারা অপেক্ষা করে—হাদী ফিরে আসবে। আবার হাদী হেঁটে আসবে। আবার মানুষের পাশে দাঁড়াবে, ঠিক আগের মতো, কিংবা আরও শক্ত হয়ে।
হাদী ফিরে আয়। এই দেশে এখনো তোকে দরকার। আবাবিলের মতো ফিরে আয়—ছোট, কিন্তু অপ্রতিরোধ্য। ইতিহাস বদলাতে যে শক্তি লাগে, তার সবটুকুই যেন তোর ভেতরে আবার জেগে ওঠে।
লেখক: মোঃ রায়হানুল বারি রাসেল,
শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
সম্পাদক : শাদমান আল আরবী | নির্বাহী সম্পাদক : তানভীর আল আরবী
ঠিকানা : ঝাউতলা, ১ম কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০। ফোন : ০১৩১৬১৮৬৯৪০, ই-মেইল : [email protected], বিজ্ঞাপন: [email protected], নিউজরুম: [email protected] © ২০২৩ রাইজিং কুমিল্লা সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত। | Design & Developed by BDIGITIC