
মো. নাজাফ উদ্দিন ইমন
বাংলার ইতিহাসে গুপ্ত যুগের পর সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হলো গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের শাসনকাল। তিনি নিজেকে ‘গৌড়েশ্বর’ ঘোষণা করে স্বাধীন শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর বাংলাজুড়ে যে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা নেমে আসে। শক্তিশালী রাজ্যগুলো অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাজ্যগুলোকে দখল করে নেয়। ইতিহাসে সেটি “মাৎস্যন্যায় ” নামে পরিচিত।
মাৎস্যন্যায় ছিল প্রাচীন ভারতের একটি রাজনৈতিক ধারণা। আর আধুনিক বিশ্বের রাজনীতিতে মাৎস্যন্যায় ফিরে এসেছে আরো ভয়াবহ রূপে।
আজকের বিশ্বে তাকালেই দেখা যায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলো ন্যায় ও আইনের ভিত্তিতে নয়, বরং শক্তির ভিত্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে। সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক প্রভাব ও কূটনৈতিক আধিপত্যের জোরে পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলো ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়ে যাচ্ছে।
এটির স্পষ্ট প্রমাণ বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়। সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান SIPRI এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্ব সামরিক ব্যয় পৌঁছেছে প্রায় ২.৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যেটি ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একাই ব্যয় করেছে প্রায় ৮৯৫ বিলিয়ন ডলার, চীন করেছে প্রায় ২৬৭ বিলিয়ন ডলার, এবং রাশিয়া প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এই তিন দেশ মিলেই বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করছে। শক্তির এই বিপুল বিনিয়োগ যে শুধু আত্মরক্ষার জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তারের জন্য, তা আর গোপনীয় নয়।
সম্প্রতিকালে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়েছে। যেখানে তার বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও অন্যান্য অভিযোগ এনে বিচার করছে। একই সময়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সহ উচ্চ পর্যায়ের নেতারা গ্রিনল্যান্ডের ওপর একটি ‘মার্কিন কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ’ বা দখলের আগ্রহ প্রকাশ করছে; যেটি সরাসরি আন্তর্জাতিক আইন বিরোধী। ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি সাক্ষাৎকারে আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই তার বলেও জানিয়েছে।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ আধুনিক আগ্রাসনের একটি বড় উদাহরণ। ২০২২ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষ নিহত বা আহত হয়েছে, এবং কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে রয়েছে।
একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনের গাজায় মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। ২০২৩ সালের শেষ ভাগ থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলী আগ্রাসনে, কয়েক মাসের মধ্যেই দশ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে এবং পুরো গাজা অঞ্চল প্রায় বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এখানেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক পরাশক্তি।
এশিয়ায় চীন–তাইওয়ান সংকট আরেকটি বড় ক্ষেত্র। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে চীন বারবার তাইওয়ানের চারপাশে বড় সামরিক মহড়া চালিয়েছে, যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে। চীন প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছে, তাইওয়ান তাদের “অবিচ্ছেদ্য অংশ” এবং প্রয়োজনে তারা শক্তি প্রয়োগ করবে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত বাংলাদেশ, নেপাল সহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে। অনেক ক্ষেত্রেই নিজের পছন্দের সরকার প্রতিষ্ঠায় পরোক্ষ হস্তক্ষেপ করছে।
আগ্রাসন বর্তমান বিশ্বে কেবল যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও এখন একটি বড় অস্ত্র। বর্তমানে বিশ্বের ৩০টির বেশি দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিষেধাজ্ঞার আওতায়। এসব নিষেধাজ্ঞার ফলে সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ দুর্ভোগ। খাদ্যসংকট, ওষুধের অভাব, মুদ্রাস্ফীতি তো আছেই। অথচ ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী বেশিরভাগ সময়ই নিরাপদে থাকে।
এর ফল সবচেয়ে বেশি ভোগ করছে সাধারণ মানুষ। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা UNHCR–এর তথ্যমতে, ২০২৪ সালে বিশ্বে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১১ কোটি; যেটি মানব ইতিহাসে সর্বোচ্চ। যুদ্ধ তৈরি করে মূলত পরাশক্তি, আর শরণার্থীর বোঝা বহন করে দরিদ্র দেশগুলো।
আন্তর্জাতিক আইন কি এই আগ্রাসন ঠেকাতে পারছে? জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতার কারণে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রায় অসম্ভব। দুর্বল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইন প্রয়োগ করা হলেও শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহের বেলায় নেমে আসে নীরবতা।
প্রাচীন কালের বিশৃঙ্খলা ছিল রাষ্ট্রহীন, আর আজ বিশৃঙ্খলা রাষ্ট্রের শক্তিতেই সংগঠিত। আমরা কি আবার এমন কোনো পৃথিবীর দিকে এগোচ্ছি, যেখানে ন্যায় নয়, কেবল শক্তিই পাবে বাঁচার অধিকার?
সম্পাদক : শাদমান আল আরবী | নির্বাহী সম্পাদক : তানভীর আল আরবী
ঠিকানা : ঝাউতলা, ১ম কান্দিরপাড়, কুমিল্লা-৩৫০০। ফোন : ০১৩১৬১৮৬৯৪০, ই-মেইল : [email protected], বিজ্ঞাপন: [email protected], নিউজরুম: [email protected] © ২০২৩ রাইজিং কুমিল্লা সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত। | Design & Developed by BDIGITIC