সফর মাসের শেষ বুধবার মুসলিম সমাজে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ নামে পরিচিত। দিনটি ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে দোয়া, মিলাদ মাহফিল, ওয়াজ-নসিহত, জিকির-আজকার ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়ে থাকে। এ উপলক্ষে প্রতিবছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছুটি রাখা হয়।
‘আখেরি চাহার সোম্বা’ মূলত আরবি ও ফারসি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘আখেরি’ অর্থ শেষ, ‘চাহার’ অর্থ চার এবং ‘শোম্বা’ অর্থ বুধবার। অর্থাৎ, সফর মাসের শেষ বুধবারকেই আখেরি চাহার সোম্বা বলা হয়।
ধর্মীয় তাৎপর্য
প্রচলিত কিছু ধর্মীয় বর্ণনায় বলা হয়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেষ অসুস্থতার সময়ে তিনি সাময়িকভাবে সুস্থতা অনুভব করেছিলেন। এ সংবাদে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে মহানবী (সা.)-এর সেই সাময়িক সুস্থতার স্মরণে সফর মাসের শেষ বুধবারকে বিশেষভাবে পালনের রীতি কিছু মুসলিম সমাজে প্রচলিত হয়।
এ দিনকে অনেকে শুকরিয়া আদায়ের দিন হিসেবে পালন করেন। এ উপলক্ষে গোসল, দুই রাকাত নফল নামাজ, দোয়া ও দান-খয়রাতসহ বিভিন্ন ইবাদত করার প্রচলন রয়েছে। দেশের বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আলোচনা, মিলাদ, দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।
তবে ইসলামি ইতিহাস ও হাদিসের গবেষকদের একটি বড় অংশের মতে, আখেরি চাহার সোম্বাকে বিশেষ ধর্মীয় দিবস হিসেবে পালনের পক্ষে নির্ভরযোগ্য ও সুস্পষ্ট দলিল পাওয়া যায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অসুস্থতা ও সাময়িক সুস্থতার বিভিন্ন ঘটনা সহিহ হাদিসে বর্ণিত হলেও সফর মাসের শেষ বুধবারকে বিশেষ ইবাদতের দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি।
কিছু প্রচলিত বর্ণনায় মহানবী (সা.)-এর ওপর জাদুর ঘটনার সঙ্গেও আখেরি চাহার সোম্বার সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। তবে গবেষক আলেমদের মতে, সহিহ বর্ণনা অনুযায়ী জাদুর ঘটনাটি সপ্তম হিজরির দিকে সংঘটিত হয়েছিল। ফলে সেটিকে ১১ হিজরির সফর মাসের শেষ বুধবারের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ নেই। (দেখুন: সহিহ বুখারি: ৫৭৬৫–৫৭৬৬; ইবনু হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি)
সফর মাস কি অশুভ?
আখেরি চাহার সোম্বাকে ঘিরে অনেকের মধ্যে ধারণা রয়েছে যে, সফর মাস আপদ-বিপদের মাস এবং শেষ বুধবার সেই বিপদ কেটে যায়। তবে কোরআন ও সহিহ হাদিসে এমন কোনো বিশ্বাসের ভিত্তি নেই।
রাসুলুল্লাহ (স.) জাহেলি যুগে প্রচলিত এসব কুসংস্কার নাকচ করে বলেছেন, ‘সংক্রমণ, অশুভ লক্ষণ, পেঁচা ও সফর সম্পর্কে (জাহেলি যুগের) এসব বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই।’ (সহিহ বুখারি: ৫৭৫৭; সহিহ মুসলিম: ২২২২)
তবে আখেরি চাহার সোম্বা পালনের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা ও এর ধর্মীয় ভিত্তি নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদও রয়েছে। তাই ব্যক্তিগতভাবে ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
নির্ভরযোগ্য হাদিসে কি এ দিনের বিশেষ ফজিলত আছে?
কোরআন কিংবা সহিহ হাদিসে সফর মাসের শেষ বুধবারকে বিশেষ ইবাদতের দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর শেষ অসুস্থতা নিয়ে সহিহ হাদিসে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু কোথাও সফর মাসের শেষ বুধবারকে ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত বিশেষ দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
ইতিহাসবিদদের মতে, শেষ অসুস্থতার সময় তিনি কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেছিলেন। তবে সহিহ হাদিসে আরও পাওয়া যায়, পরবর্তী সময়েও তিনি একাধিকবার কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেন এবং সাহাবিদের সঙ্গে নামাজেও অংশ নেন। (সহিহ বুখারি: ৬৬৪, ৬৮০, ৬৮১; সহিহ মুসলিম: ৪১৮)
এর অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই, ইসলামের ইতিহাসে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী, রবিউল আউয়াল মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন। এ কারণে নির্দিষ্টভাবে সফর মাসের শেষ বুধবারকে ধর্মীয়ভাবে বিশেষ ইবাদতের দিন বলা কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন বহু গবেষক আলেম।

