শনিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

আঁধার জয় করে আলোর পথে চান্দিনা: সৌরবাতিতে বদলে গেছে গ্রামীণ জনপদ

ওসমান গনি, চান্দিনা প্রতিনিধি

Rising Cumilla - Rural towns have been transformed by solar power and solar panels, conquering darkness and giving way to light.
আঁধার জয় করে আলোর পথে চান্দিনা: সৌরবাতিতে বদলে গেছে গ্রামীণ জনপদ

এক সময় সূর্য ডুবলেই কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে নেমে আসত ঘুটঘুটে অন্ধকার। জরুরি প্রয়োজনে এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায় যেতেও মানুষকে হারিকেন কিংবা টর্চলাইটের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু সেই চিত্র এখন অতীত। প্রযুক্তির কল্যাণে এবং স্থানীয় প্রশাসনের বিশেষ উদ্যোগে চান্দিনার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামীণ জনপদ এখন রাতেও থাকে দিনের মতো আলোকিত। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসানো আধুনিক সৌরবাতি বা সোলার স্ট্রিট লাইট বদলে দিয়েছে কয়েক লাখ মানুষের জীবনযাত্রা। এই উদ্যোগের ফলে কেবল জননিরাপত্তাই বাড়েনি, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটেও লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া।

উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বাজার এলাকা, মসজিদ, মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে সুউচ্চ খাম্বায় বসানো হয়েছে এই সোলার প্যানেলগুলো। এতে কোনো প্রকার বিদ্যুৎ সংযোগের প্রয়োজন হয় না; দিনের বেলা সূর্যের আলো থেকে শক্তি সঞ্চয় করে ব্যাটারিতে জমা থাকে এবং সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে ওঠে বাতিগুলো। সরকারের টিআর-কাবিখা ও বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এই সৌরবাতিগুলো স্থাপন করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তির কারণে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর চাপ কমছে, আবার দীর্ঘমেয়াদে এটি রক্ষণাবেক্ষণও বেশ সাশ্রয়ী। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে লোডশেডিং হলে পুরো এলাকা অন্ধকারে নিমজ্জিত হতো, কিন্তু এখন বিদ্যুৎ থাকুক বা না থাকুক, সড়কগুলো সবসময়ই আলোকিত থাকে।

আলোকিত এই পথ চলায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। পর্যাপ্ত আলোর অভাবে আগে নির্জন সড়কে চুরি, ছিনতাই কিংবা সাপের ভয়ে মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারতেন না। বর্তমানে সৌরবাতির নিচে দাঁড়িয়ে রাতেও মানুষ নিশ্চিন্তে যাতায়াত করতে পারছেন। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের চলাফেরা আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ হয়েছে। চান্দিনার বরকইট ও মাইজখার ইউনিয়নের বদরপুর বাজারের ব্যাবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আগে সন্ধ্যার পর বাজারগুলো জনশূন্য হয়ে পড়ত। এখন সৌরবাতির কল্যাণে গ্রামীণ হাট-বাজারে রাত ১০টা পর্যন্ত বেচাকেনা চলছে। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় বেড়েছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি গতিশীল হচ্ছে। অনেক স্থানে তরুণদের এই বাতির নিচে বসে সামাজিক আলোচনা বা পড়াশোনা করতেও দেখা যায়।

উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, একটি নিরাপদ ও স্মার্ট উপজেলা গড়ে তোলার লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি গ্রামকেই এই সুবিধার আওতায় আনার কাজ চলছে। বিশেষ করে যেখানে বিদ্যুতের লোডশেডিং বেশি হয়, সেখানে এই সৌরবাতি সাধারণ মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, টেকসই উন্নয়নের এটি একটি অনন্য উদাহরণ। প্রযুক্তির এই আলো কেবল অন্ধকার সড়ককেই আলোকিত করেনি, বরং মানুষের মনেও এক ধরনের স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছে। অন্ধকার জয় করে চান্দিনার এই এগিয়ে চলা এখন আশপাশের অন্য অনেক এলাকার জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রামগুলোতে এখন আর রাতের ভয় নেই, আছে আধুনিকতার দীপ্তি। প্রযুক্তির আলোয় অন্ধকারকে জয় করে চান্দিনার এই সফল পথচলা গ্রামীণ জনপদকে করছে আরও সমৃদ্ধ ও নিরাপদ।

আরও পড়ুন