
‘সংঘাত নয়, শান্তি ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ি’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জেলায় “আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি: বাস্তবতা ও করণীয়” শীর্ষক এক আঞ্চলিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল শনিবার (১৭ জানুয়ার) জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এ সংলাপের আয়োজন করে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশ।
সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ফাতিমা সুলতানা। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের এআইপি এস প্রকল্পের এরিয়া কো-অর্ডিনেটর রাসেল আহমেদ।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক শাহাদাত উল্যাহ-এর সভাপতিত্বে এবং আবৃত্তি শিল্পী সৈয়দ আশ্রাফুল হক আরমান-এর সঞ্চালনায় আয়োজিত সংলাপে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন—ইসলাম ধর্মের প্রতিনিধি কুঠিরহাট কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব মওলানা নুরুল করিম, হিন্দু ধর্মীয় প্রতিনিধি নারায়ণ চন্দ্র চক্রবর্তী, খ্রিষ্টান ধর্মীয় প্রতিনিধি সুবীর সরকার দিলু, বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিনিধি স্মৃতি রত্ম ভিক্ষু, পিস অ্যাম্বাসেডর নেটওয়ার্ক-এর জয়েন্ট কো-অর্ডিনেটর নাজনিন আক্তার নিপা ও কামরুল হাসান লিটন।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিস ফ্যাসিলিটেটর গ্রুপ (পিএফজি)-এর পরশুরাম উপজেলার পিস অ্যাম্বাসেডর জোহরা আক্তার রুমা। অনুষ্ঠানের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন পিএফজি ফেনী সদর উপজেলার সদস্য জান্নাতুল ফেরদৌস মিতা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ফাতিমা সুলতানা বলেন, “বাংলাদেশ একটি অসম্প্রদায়িক দেশ। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হলেও হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মাবলম্বীর মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিদ্যমান। বাংলাদেশে একের পর এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু আমাদের সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের জায়গাটি অপরিবর্তিত রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং বিভিন্ন ধরনের তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে ছোট ছোট বিষয়কে কেন্দ্র করে সংঘাত তৈরি হচ্ছে। ব্যক্তিগত অপকথা, অসৎ উদ্দেশ্য কিংবা অপরাজনীতির বশবর্তী হয়েও মানুষ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। তবে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে হলে এসব প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মওলানা নুরুল করিম বলেন, “আমাদের বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থে ধর্মীয় কোনো কোন্দল নেই—বিশেষ করে ফেনীতে। ফেনী বড় মসজিদের পাশে মন্দির রয়েছে, জহিরিয়ার পাশেও মন্দির রয়েছে, কিন্তু কেউ কারো দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। অনেকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য নিজেদের সংঘাতকে ধর্মীয় সংঘাত হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। তাই পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করলে ধর্মীয় বিভেদ সম্ভব নয়।”
হিন্দু ধর্মীয় প্রতিনিধি নারায়ণ চন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, “আমরা যদি আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে পারি এবং সন্তানদের সুশিক্ষা দিতে পারি, তাহলে তাদের মধ্যে নৈতিক দৃঢ়তা তৈরি হবে। পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে ধর্মীয় উপাসনালয়ে এই সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। উচ্চ শিক্ষার মাধ্যমে সন্তানদের মধ্যে সম্প্রীতির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।”
খ্রিষ্টান ধর্মীয় প্রতিনিধি সুবীর সরকার দিলু বলেন, “আমাদের দেশে মসজিদের পাশে মন্দির এবং চার্চের পাশে মসজিদ রয়েছে—এটাই তো সম্প্রীতির বড় প্রমাণ। কিন্তু আমরা কেন বারবার মনে করি এই সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে? আমি যদি আমার ধর্ম সঠিকভাবে পালন করি, তাহলে আমার দ্বারা সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার প্রশ্নই আসে না। কারণ আমরা পরস্পরকে ভালোবাসি, আর ভালোবাসা থাকলে সম্প্রীতি নষ্ট হয় না।”
বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিনিধি স্মৃতি রত্ম ভিক্ষু বলেন, “আমরা সবাই এক। আমাদের সবাইকে মিলেমিশে থাকতে হবে। রক্তের বন্ধনের মতো একসঙ্গে চলতে হবে।”
সংলাপের উন্মুক্ত আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন— জেলা হাফেজ পরিষদের সভাপতি হাফেজ জাকির হোসেন মজুমদার, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি শুকদেব নাথ তপন, ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী আ.ন.ম আবদুর রহীম, পুরোহিত বিজয় চক্রবর্তী, অ্যাডভোকেট আবদুল ওয়াদুদ, অ্যাডভোকেট সরোয়ার হোসেন লাভলু এবং সাংবাদিক আরিফুর রহমান।
অনুষ্ঠান বাস্তবায়নে সার্বিক সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন প্রকল্পের ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর খোদেজা বেগম।









