
সুইজারল্যান্ডের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষতার নীতি আরও কঠোর করার প্রস্তাব নিয়ে আজ রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দেশটির কট্টর ডানপন্থীদের সমর্থিত এই উদ্যোগটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে।
জনমত জরিপগুলো বলছে, অধিকাংশ ভোটার প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। বিরোধীরা উদ্যোগটিকে ‘রাশিয়াপন্থী’ বলেও অভিহিত করেছে। খবর এএফপির।
সুইজারল্যান্ডের সরাসরি গণতন্ত্র ব্যবস্থার অংশ হিসেবে স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শুরু হবে। তবে দেশটির বেশিরভাগ মানুষ ডাকযোগে আগেই ভোট দিয়ে থাকেন।
সুইস জনগণ সাধারণভাবে তাদের দেশের নিরপেক্ষতাকে ব্যাপকভাবে সমর্থন করেন। তবে সংবিধানে নিরপেক্ষতার একটি কঠোর সংজ্ঞা যুক্ত করার এই উদ্যোগ দেশটির নিরপেক্ষতার প্রকৃত অর্থ কী— তা নিয়ে গভীর মতপার্থক্য সামনে এনেছে।
ঐতিহ্যগতভাবে সুইজারল্যান্ডের অবস্থান হলো শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা বজায় রেখে সামরিকভাবে নিরপেক্ষ থাকা। কিন্তু ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ শুরুর পর বিদেশি সংঘাতে সুইজারল্যান্ডের কতটা সম্পৃক্ত হওয়া উচিত, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বার্ন সরকারের ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা সমর্থনের সিদ্ধান্তে উদ্বিগ্ন হয়ে সার্বভৌমত্বপন্থী সংগঠন ‘প্রো সুইজারল্যান্ড’ দেশটির সংবিধানে নিরপেক্ষতাকে আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে গণভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্বাক্ষর সংগ্রহ করে।
দেশটির প্রায় পুরো রাজনৈতিক নেতৃত্বই এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। জনমত জরিপেও দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ ভোটারও এটি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।
অন্যদিকে, রাশিয়া সুইজারল্যান্ডের ইইউ নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেওয়ার সমালোচনা করে আসছে এবং বার্ন তাদের নিরপেক্ষতা পরিত্যাগ করেছে বলে অভিযোগ করেছে। একই সঙ্গে মস্কো এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে এর বিরোধীরা এটিকে ‘রাশিয়াপন্থী’ উদ্যোগ বলে আখ্যা দিয়েছে।
প্রস্তাবটিতে সংবিধানে সুইজারল্যান্ডের নিরপেক্ষতাকে ‘সশস্ত্র ও চিরস্থায়ী’ হিসেবে নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের নিরপেক্ষতার ঐতিহ্য ১৫১৬ সাল থেকে চলে আসছে এবং ১৮১৫ সাল থেকে তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। প্রস্তাবটি পাস হলে দেশটি ন্যাটোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে না। একই সঙ্গে দেশ আক্রান্ত না হলে কোনো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার সুযোগও থাকবে না।
এ ছাড়া জাতিসংঘের আহ্বান ছাড়া কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
গণভোটের পক্ষে-বিপক্ষে থাকা উভয় পক্ষই বলছে, তারা সুইজারল্যান্ডের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে চায়।
তবে সুইস সরকার ও দেশটির পার্লামেন্ট প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, এটি অতিরিক্ত কঠোর এবং বর্তমান সময়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে দেশটির কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত করবে।
সম্প্রতি টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিতর্কে সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইগনাজিও ক্যাসিস বলেন, নিরপেক্ষতা সবসময় কিছুটা নমনীয়তার সঙ্গে প্রয়োগ করা হয়েছে।
ইগনাজিও ক্যাসিস আরও জানান, ইউক্রেনসহ সংঘাতপূর্ণ দেশগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রির ওপর সুইজারল্যান্ডের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, নিরপেক্ষতার অর্থ উদাসীন থাকা নয়।
তার ভাষায়, শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়া আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘিত হতে দেখলে আমরা চোখ ফিরিয়ে নেব না।
দেশটির প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রায় সবাই এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে।
টেলিভিশন বিতর্কে ব্যতিক্রম কট্টর ডানপন্থী সুইস পিপলস পার্টির (এসভিপি) ভাইস প্রেসিডেন্ট সেলিন আমোদরু বলেন, আমাদের লক্ষ্য শান্তি, কূটনীতি ও সংলাপকে উৎসাহিত করা।
সেলিন আমোদরু বলেন, এটি অর্জনের জন্য চিরস্থায়ী সশস্ত্র নিরপেক্ষতার মাধ্যমে আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে হবে।
শুরুতে কয়েকটি জনমত জরিপে ভোটের ফলাফল খুব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। তবে সর্বশেষ দুটি জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশেরও বেশি ভোটার এই উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।
রোববারের ভোটে আরেকটি জাতীয় উদ্যোগেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নির্দলীয় একটি নাগরিক আন্দোলনের উত্থাপিত প্রস্তাবে দেশের খাদ্যে স্বনির্ভরতার হার বর্তমান ৪২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশে উন্নীত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
২০২৪ সালে সুইজারল্যান্ডের খাদ্যে স্বনির্ভরতার হার ছিল ৪২ শতাংশ।
দেশটির সরকার সতর্ক করে বলেছে, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন, এমনকি সম্ভব নাও হতে পারে। দেশটির অধিকাংশ বড় রাজনৈতিক দলও প্রস্তাবটিকে অবাস্তব বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।










