সোমবার ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: কুমিল্লা-৭ আসনে বহুমুখী নির্বাচনী হাওয়া

ওসমান গনি, চান্দিনা প্রতিনিধি

কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনের প্রার্থীরা/ছবি: প্রতিনিধি

আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে উত্তেজনা বিরাজ করছে, তার ঢেউ লেগেছে কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনেও। এই আসনটি ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিটি নির্বাচনেই এখানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষ্য করা যায়। আগামী নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর পাশাপাশি ইসলামী দল এবং জোটের শরিকদের সক্রিয় উপস্থিতির কারণে নির্বাচনী সমীকরণ এবার আরও জটিল হতে চলেছে।

দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করতে না পারা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবার এই আসনটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া। চান্দিনা উপজেলা বিএনপির সুসংগঠিত নেতা-কর্মীদের মধ্যে থেকে এবার একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন পেতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন, চান্দিনা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আতিকুল আলম শাওন। তরুণ নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গে তার নিবিড় সংযোগ তাকে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে রেখেছে। তিনি প্রতিনিয়ত এলাকায় গণসংযোগ করছেন এবং বিগত সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ইস্যুতে সাধারণ ভোটারদের একত্রিত করে আন্দোলন করেছেন এখনও তিনি মরিয়া হয়ে দলের জন্য কাজ করছেন। আতিকুল আলম শাওন মনে করেন, তরুণ প্রজন্মের ভোট এবং স্থানীয় সংগঠনে তার নেতৃত্ব তাকে চূড়ান্ত মনোনয়ন এনে দেবে।

অন্যদিকে, বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায় আরেকটি প্রভাবশালী নাম হলো, ইঞ্জিনিয়ার কাজী সাখাওয়াত হোসেন। তিনি একজন পেশাজীবী নেতা হিসেবে সমাজে সুপরিচিত এবং ক্লিন ইমেজ সম্পন্ন। শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তিনি মনে করেন, চান্দিনার উন্নয়নে কারিগরি জ্ঞান ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করার সুযোগ রয়েছে, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করবে। তার প্রচেষ্টা হলো প্রযুক্তি ও আধুনিকতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের মন জয় করা। এই দুই নেতার মধ্যে মনোনয়ন নিয়ে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা থাকলেও, দলীয় সূত্র বলছে, শেষ পর্যন্ত দল যাকে প্রতীক দেবে, তার পক্ষেই সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে।

তবে, এই আসনের নির্বাচনী হাওয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দিয়েছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-এর মহাসচিব ও সাবেক সাংসদ ডক্টর রেদোয়ান আহমেদ। বিএনপি জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে পরিচিত এই নেতা চান্দিনার রাজনীতিতে একসময় প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি একাধিকবার এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাকে একজন শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করছে। জোটের প্রার্থী হিসেবে ডক্টর রেদোয়ান আহমেদ মনোনয়ন পেলে, তা নিঃসন্দেহে বিএনপি জোটের নির্বাচনী শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। তিনি তার অতীত উন্নয়নমূলক কাজের ফিরিস্তি তুলে ধরে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন।

এছাড়াও, এই নির্বাচনে ইসলামী দলগুলোর উপস্থিতি একটি উল্লেখযোগ্য ফ্যাক্টর হতে পারে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে মাঠে সক্রিয় আছেন মাওলানা মোশাররফ হোসেন। চান্দিনায় জামায়াতের একটি নিজস্ব ও নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক রয়েছে, যা মাওলানা মোশাররফকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকার সাহস যোগাচ্ছে। তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং স্থানীয় জনগণের সমস্যা নিয়ে কাজ করার মাধ্যমে তার জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে, খেলাফত মজলিস থেকে মনোনয়ন চাইছেন মাওলানা সোলাইমান খান। তিনি তার দলের আদর্শের ভিত্তিতে একটি ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার বার্তা নিয়ে জনসাধারণের কাছে যাচ্ছেন। তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষ এখন ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি অধিক আকৃষ্ট, যা তার জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। একইসঙ্গে, ইসলামী দলগুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় দল বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন-এর পক্ষ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন মাওলানা মুফতি এহতেসামুল হক কাসেমী। তরুণদের মধ্যে ধর্মীয় জাগরণ এবং দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতির স্লোগান তুলে তিনি ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কুমিল্লা-৭ আসনে বিএনপি ও তার জোটের একাধিক প্রভাবশালী প্রার্থীর উপস্থিতির কারণে এবারের নির্বাচন ত্রিমুখী বা চতুর্মুখী লড়াইয়ের দিকে যেতে পারে। ডক্টর রেদোয়ান আহমেদ এবং বিএনপির দুই নেতার প্রতিযোগিতা একপাশে যেমন জোটের শক্তি বাড়াবে, তেমনি অন্যদিকে তাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব নির্বাচনী কৌশলকে জটিল করে তুলতে পারে। অন্যদিকে, ইসলামী দলগুলো যদি শেষ মুহূর্তে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে, তবে তাদের সম্মিলিত ভোট একাধিক প্রার্থীর মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে, যা হয়তো ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর জন্য সুবিধা বয়ে আনতে পারে। চান্দিনার ভোটাররা আগামী দিনগুলোতে কোন প্রার্থীর ওপর আস্থা রাখেন, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। এই আসনটির ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কৌশল ও ফলাফল এখন স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের প্রধান আলোচনার বিষয়।

আরও পড়ুন