
রমজান শুধু একটি মাস নয়—এটি আত্মশুদ্ধির এক অনন্য বিদ্যালয়, রহমত ও মাগফিরাতের অফুরন্ত মৌসুম। এ মাসে প্রতিটি ইবাদতের সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। বদলে যায় একজন মুমিনের চিন্তা, চরিত্র ও জীবনধারা।
আল্লাহ তাআলা যেন এই মহাসুযোগ কাউকে অপ্রস্তুত অবস্থায় না দেন—সে জন্যই একজন সচেতন মুমিনের উচিত রমজান আগমনের আগেই নিজেকে প্রস্তুত করে নেওয়া। কারণ, যে যত সুন্দর প্রস্তুতি নেবে, সে তত গভীরভাবে রমজানের বরকত লাভ করতে পারবে।
জ্ঞানার্জনের প্রস্তুতি
জ্ঞান অর্জন করা মুসলিম নারী–পুরুষ সবার ওপর ফরজ। তাই রমজানের আগে রোজা, তারাবিহ, জাকাত, ফিতরা, কুরআন তিলাওয়াত ও কিয়ামুল লাইল–সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েল জেনে নেওয়া জরুরি।
রমজান যেহেতু কুরআন নাজিলের মাস, তাই এ মাসে কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যারা শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে পারেন না, তারা এখনই তিলাওয়াত শেখার উদ্যোগ নিন। আর যারা তিলাওয়াত জানেন, তারা কুরআনের অর্থ ও তাফসির অধ্যয়নে সময় ব্যয় করুন।
পাশাপাশি ইসলামি জ্ঞানার্জনের জন্য কিছু উপকারী বই নির্বাচন করে নিন এবং কখন কোন বই পড়বেন—তার একটি পরিকল্পনাও তৈরি করে ফেলুন।
ব্যক্তিগত প্রস্তুতি
রমজান মাসটি কীভাবে কাটাবেন—তার একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা আগে থেকেই তৈরি করা প্রয়োজন। দিনের কোন সময় কোন কাজ করবেন, কখন ইবাদত করবেন এবং রাত কীভাবে কাটাবেন—এসব বিষয়ে একটি বাস্তবসম্মত রুটিন বানান।
সংসার, চাকরি বা ব্যবসার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কখন কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, নফল নামাজ বা দোয়া করবেন—তা আগে থেকেই নির্ধারণ করে নিলে রমজান হবে আরও ফলপ্রসূ ও সুশৃঙ্খল।
পারিবারিক প্রস্তুতি
রমজান মাসে একটি মুসলিম পরিবারে ইবাদতের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই পরিবারকেন্দ্রিক প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি।
পরিবারের সদস্যদের রোজার ফজিলত ও রমজানের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করুন। ঘরে তালিমের পরিবেশ তৈরি করুন। সবাই মিলে সাহরি, ইফতার, নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াতের একটি পারিবারিক রুটিন নির্ধারণ করুন—যাতে পুরো পরিবার একসঙ্গে নেক আমলের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
সামাজিক প্রস্তুতি
রমজান মাসে সমাজ যেন পাপ ও অশালীনতা থেকে মুক্ত থাকে—এ জন্য সমাজের অভিভাবক, মুরুব্বি ও দায়িত্বশীলদের আগেভাগেই উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
বাজার, রাস্তা, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক পরিসরকে ইসলামবান্ধব রাখতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে, যেন রমজানের পবিত্রতা সর্বত্র বজায় থাকে এবং ইবাদতের পরিবেশ সুদৃঢ় হয়।
গৃহিণীর প্রস্তুতি
রমজানে সাহরি ও ইফতার ব্যবস্থাপনায় নারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই মা, বোন বা স্ত্রী হিসেবে রমজান আগমনের আগেই রান্না ও সংসার ব্যবস্থাপনার একটি সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি নেওয়া উত্তম।
কিছু কাজ আগে থেকেই এগিয়ে রাখলে ইবাদতে মনোযোগ দেওয়া সহজ হয়। সংসারের কাজে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে যেন ফরজ নামাজ ও তারাবিহ ছুটে না যায়—সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি
রমজানে সাধারণত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে অভিভাবকরা সন্তানদের কুরআন শিক্ষা ও ইসলামি আদব শেখানোর ব্যবস্থা নিতে পারেন।
শিক্ষার্থীরাও বিভিন্ন ইসলামি কোর্স, অনলাইন ক্লাস বা আত্মোন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে সময়কে অর্থবহ করে তুলতে পারে।
চাকরিজীবীদের প্রস্তুতি
চাকরিজীবীর দায়িত্ব হলো—অফিসে মালিককে না ঠকানো এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে নিজেকেও বঞ্চিত না করা। রমজানের পবিত্রতা রক্ষার্থে সব ধরনের অনৈতিক অভ্যাস ত্যাগ করা জরুরি।
অফিসের কাজের ফাঁকে, যাতায়াতের সময় কিংবা বিরতিতে জিকির, দোয়া ও কুরআন তিলাওয়াতে নিজেকে ব্যস্ত রাখা যেতে পারে। মোবাইলে কুরআন ও ইসলামি অ্যাপ ব্যবহার করাও এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি
রমজান এলেই কিছু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত লাভের আশায় পণ্য মজুত করে রাখেন—ইসলাম এ ধরনের কাজ সমর্থন করে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে ‘বড়লোক’ হওয়ার চিন্তা একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর আদর্শ হতে পারে না।
বরং রমজানে কীভাবে দাম কমিয়ে, সহজ করে রোজাদারদের সহযোগিতা করা যায়—সে প্রস্তুতি নেওয়াই হবে প্রকৃত সওয়াবের পথ। কেননা পণ্য মজুত করা গুনাহের কাজ। হাদিসে এসেছে—
مَنْ احْتَكَرَ فَهُوَ خَاطِئٌ
“যে ব্যক্তি পণ্য মজুত করে, সে গুনাহগার।” (মুসলিম ১৬০৫)
রমজান এমন এক মহিমান্বিত অতিথি—যে প্রস্তুত ঘরে এলে বরকত উজাড় করে দেয়, আর অপ্রস্তুত ঘর থেকে নীরবে বিদায় নেয়।
তাই আসুন, আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে রমজানের জন্য আন্তরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করি—জ্ঞান, আমল, চরিত্র ও সমাজ—সব ক্ষেত্রে।
আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে রমজান পাওয়ার তৌফিক দান করেন, যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে রমজানকে গ্রহণ করার শক্তি দেন এবং এই মাসকে আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মাধ্যম বানান। আমিন।










