
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি আনুষ্ঠানিকভাবে রবিবার (১ মার্চ) সকালে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাহাদাত বরণের খবর নিশ্চিত করে। জানানো হয়, শনিবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এক যৌথ হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, খামেনি তার দপ্তরে নির্ধারিত দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় হামলার শিকার হন।
ইরানের এই সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার নিহতে খবর নিশ্চিত হওয়ার পর দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। তবে তার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষিত উত্তরসূরি না থাকায় পরবর্তী নেতৃত্ব কে নেবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এরইমধ্যে বেশ কয়েকজনের নাম ওঠে আসছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে।
খামেনির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে প্রায় ৪০ বছরের শাসনের অবসান ঘটলো। বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্ধারণ করা ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংবিধান অনুযায়ী, ৮৮ সদস্যের ধর্মীয় নেতাদের পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে। এই পরিষদের সদস্যরাই ভোটের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব ঠিক করবেন।
নেতৃত্ব নির্বাচনের যোগ্যতা
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা হতে হলে প্রার্থীকে অবশ্যই একজন পুরুষ ও উচ্চপর্যায়ের ধর্মীয় আলেম হতে হবে। পাশাপাশি তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। দেশের জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতায় এসব যোগ্যতা বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আলোচনায় যেসব সম্ভাব্য নাম
মোজতবা খামেনি
মোজতবা খামেনি, আয়াতুল্লাহ খামেনির দ্বিতীয় পুত্র, সম্ভাব্য উত্তরসূরীদের তালিকায় অন্যতম আলোচিত নাম। ৬০ বছর বয়সী মোজতবার সঙ্গে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) ও স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী ‘বাসিজ’-এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়। তবে ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্রের বিরোধিতা রয়েছে এবং সরকারে তার কোনো আনুষ্ঠানিক পদ না থাকাও তার সম্ভাবনার ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আলিরেজা আরাফি
৬৭ বছর বয়সী আলিরেজা আরাফি খামেনির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তিনি বর্তমানে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের ডেপুটি চেয়ারম্যান এবং প্রভাবশালী গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য। ইরানের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। যদিও তিনি বড় কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিলেন না, তবুও তার প্রশাসনিক ও ধর্মীয় প্রভাব তাকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সামনে এনেছে।
মোহাম্মদ মেহদি মিরবাঘেরি
প্রায় ৬০ বছর বয়সী মোহাম্মদ মেহদি মিরবাঘেরি রক্ষণশীল ধর্মীয় গোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিনিধি। তিনি অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সদস্য এবং পশ্চিমা বিশ্বের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত। কোম শহরের একটি ইসলামি বিজ্ঞান একাডেমির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার আদর্শিক অবস্থান তাকে কট্টরপন্থী মহলে জনপ্রিয় করেছে।
হাসান খোমেনি
৫০ বছর বয়সী হাসান খোমেনি সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সী। তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি-এর নাতি। ঐতিহাসিক ও পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে ধর্মীয় ও বিপ্লবী পরিমণ্ডলে তার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, যা তাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছে।
হাশেম হোসেইনি বুশেহরি
ষাটোর্ধ্ব সিনিয়র আলেম হাশেম হোসেইনি বুশেহরি অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত। তিনি এই কমিটির প্রথম ডেপুটি চেয়ারম্যান ছিলেন। খামেনির ঘনিষ্ঠ হলেও সামরিক বাহিনী আইআরজিসির সঙ্গে তার সম্পর্ক ততটা দৃঢ় নয় বলে জানা গেছে।
সামনে কী?
নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্ধারণে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের সদস্যদের একত্রিত করা এখন জরুরি। তবে বর্তমান জটিল ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের দ্রুত একত্র করা সম্ভব হবে কি না—সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।
ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক—সবকিছুই এখন অনেকাংশে নির্ভর করছে কে হচ্ছেন পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা।








