
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বড় গোবিন্দপুর গ্রামের মাঠে এখন সোনালী ফসলের হাসি। সেই হাসির কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছেন কৃষক তোফায়েল আহমেদ। গতানুগতিক ফসলের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে তিনি এবার ঝুঁকেছিলেন বাদাম চাষের দিকে। আর সেই স্বপ্ন তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে অভাবনীয় সাফল্য।
মাত্র ১২ শতাংশ জমিতে বাদাম চাষ করে তোফায়েল আহমেদ এখন এলাকার কৃষকদের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম। তার এই সাফল্য যেন এক রূপকথার গল্পের মতোই, যেখানে কঠোর পরিশ্রম আর সঠিক পরামর্শ মিলেমিশে একাকার হয়েছে।
সবকিছু যে খুব সহজ ছিল, তা কিন্তু নয়। যখন তোফায়েল বাদাম চাষের সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন অনেকেই তাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু নিজের লক্ষ্য থেকে তিনি সরে আসেননি। কৃষি বিভাগের সহায়তায় তিনি জমি তৈরি থেকে শুরু করে বীজ বপন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত যত্নসহকারে সম্পন্ন করেছেন। এই পুরো যাত্রায় তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন চান্দিনা পৌর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জনাব গোলাম সারোয়ার।
চারা গজানোর পর থেকে বাদাম তোলা পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তে গোলাম সারোয়ার তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন। মাটির গুণাগুণ বুঝে সার প্রয়োগ এবং রোগবালাই দমনে সঠিক সময়ে কীটনাশকের ব্যবহার,এই কারিগরি সহযোগিতাগুলোই মূলত তার ফসলকে বাম্পার ফলনের দিকে নিয়ে গেছে।
তোফায়েল আহমেদের হিসাব মতে, ১২ শতাংশ জমিতে বাদাম চাষ করতে তার সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে মাত্র ১০ হাজার টাকার মতো। সার, বীজ, চাষাবাদ এবং শ্রমিক—সব খরচ বাদ দিলেও লাভ যে ভালো থাকবে, তা তিনি আগেই নিশ্চিত হয়েছিলেন। আর ফলন তোলার পর সেই আনন্দ বহুগুণ বেড়ে গেছে।
তিনি প্রায় ৪ থেকে ৫ মণ উন্নত মানের বাদাম পেয়েছেন। বর্তমান বাজারদরে এই পরিমাণ বাদাম বিক্রি করে তার যে আয় হবে, তা বিনিয়োগের তুলনায় অনেক বেশি। স্বল্প সময়ে এবং কম পুঁজিতে এমন লাভজনক ফসল চাষের নজির গড়ে তিনি স্থানীয় কৃষকদের জন্য একটি বড় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
বড় গোবিন্দপুর গ্রামের এই মাঠ এখন অন্যদের জন্যও শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। আশপাশের গ্রামের কৃষকরা তোফায়েলের বাদাম ক্ষেত দেখতে আসছেন এবং তার কাছ থেকে জানছেন চাষাবাদের পদ্ধতি। অনেকেই এখন তোফায়েলের দেখানো পথে আগামী মৌসুমে বাদাম চাষের পরিকল্পনা করছেন।
কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং সঠিক পরিচর্যা পেলে এ অঞ্চলে বাদাম চাষ করে কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবেন। তোফায়েল আহমেদের এই উদ্যোগ কেবল তার নিজের ভাগ্যই বদলায়নি, বরং পুরো এলাকার কৃষিখাতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
কৃষক তোফায়েল আহমেদ আজ অত্যন্ত খুশি। তিনি মনে করেন, শুধুমাত্র গতানুগতিক ধান বা সবজি চাষের ওপর নির্ভর না করে যদি মাটির ধরন অনুযায়ী লাভজনক ফসলের দিকে নজর দেওয়া যায়, তবে কৃষিতে টিকে থাকা অনেক সহজ। আগামীতে তিনি নিজের জমির পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। গোলাম সারোয়ারের মতো নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তাদের সহযোগিতা এবং তোফায়েলের মতো সাহসী কৃষকদের উদ্যম থাকলে আমাদের কৃষি ব্যবস্থা যে সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বড় গোবিন্দপুরের এই বাদাম ক্ষেত শুধু কয়েক মণ ফসলের গল্প নয়, এটি একটি পরিশ্রমী মানুষের সফল হওয়ার গল্প এবং একটি সমৃদ্ধ আগামীর প্রতিশ্রুতি। তোফায়েল আহমেদ আজ প্রমাণ করেছেন যে, প্রবল ইচ্ছা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে বাংলাদেশের মাটি থেকেই সোনার ফসল ফলানো সম্ভব।









