শনিবার ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ইতিহাসের বাতিঘর: চান্দিনার ভাষা সৈনিক আবদুল জলিল ভূঁইয়া

ওসমান গনি, চান্দিনা প্রতিনিধি

Rising Cumilla - Lighthouse of History- Abdul Jalil Bhuiyan, the Language Soldier of Chandina
কুমিল্লার চান্দিনার কৃতি সন্তান ভাষা সৈনিক মোঃ আবদুল জলিল ভূঁইয়া/ছবি: প্রতিনিধি

বাংলার প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন আর অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে যারা নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন, কুমিল্লার চান্দিনার কৃতি সন্তান ভাষা সৈনিক মোঃ আবদুল জলিল ভূঁইয়া তাদের মধ্যে অন্যতম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯২৯ সালের ৯ জানুয়ারি চান্দিনা উপজেলার হারং গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে যার জন্ম, সেই মানুষটিই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন রাজপথের লড়াকু সৈনিক ও আদর্শ শিক্ষক। তার শৈশব কেটেছে শেকড়ের টানে, আর যৌবন অতিবাহিত হয়েছে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায়।

বরকামতা হাইস্কুল থেকে মেধার স্বাক্ষর রেখে ম্যাট্রিকুলেশন পাসের পর জগন্নাথ কলেজে অধ্যয়নকালেই তিনি নিজেকে সঁপে দেন ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে। ৫২-এর অগ্নিঝরা দিনগুলোতেও তার কণ্ঠ ছিল উচ্চকিত, মিছিলে ছিলেন অগ্রণী। কেবল ভাষা আন্দোলনেই থেমে থাকেনি তার সংগ্রামী জীবন; ৫৮-এর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-এর ৬ দফা এবং ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানেও তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক আপসহীন কণ্ঠস্বর। রাজনীতির মাঠে তিনি কতটা অবিচল ছিলেন, তার প্রমাণ মেলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদে তার অংশগ্রহণ এবং কারাবরণের দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্য দিয়ে।

১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্মুখ সমরে না থাকলেও নেপথ্যের কারিগর হিসেবে তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করায় দখলদার পাকবাহিনী আক্রোশে তার বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তবুও টলাতে পারেনি তার দেশপ্রেমকে। স্বাধীনতার পর ৭৪-এর দুর্ভিক্ষে আর্তমানবতার সেবা কিংবা ৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ—সবখানেই ছিল তার সাহসি পদচারণা। রাজপথের এই যোদ্ধা ব্যক্তিজীবনে ছিলেন একজন একনিষ্ঠ শিক্ষক। ১৯৫৪ সালে শিক্ষকতা শুরু করে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত তিনি মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়া ছিল তার শিক্ষকতা জীবনের অন্যতম এক স্বীকৃতি। নিঃসন্তান এই মানুষটি নিজের কোনো উত্তরাধিকার রেখে যাননি ঠিকই, কিন্তু রেখে গেছেন এক বিশাল কর্মময় ইতিহাস ও অগুনতি গুণগ্রাহী।

২০০৮ সালের ২৩ অক্টোবর এই জনপদকে কাঁদিয়ে বিদায় নেন এই প্রচারবিমুখ দেশপ্রেমিক। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হলেও আজ বড় বেদনার সঙ্গে লক্ষ্য করা যায় যে, সময় গড়ানোর সাথে সাথে স্থানীয়ভাবে তার স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগগুলো ফিকে হয়ে আসছে। স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, ভাষা সৈনিক আবদুল জলিল ভূঁইয়ার অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে কোনো দৃশ্যমান বা স্থায়ী স্থাপনা আজও গড়ে ওঠেনি। ‘ভাষা সৈনিক আবদুল জলিল স্মৃতি সংসদ’ নামে একটি সংগঠন থাকলেও তাদের সীমাবদ্ধতায় নতুন প্রজন্মের কাছে এই মহানায়কের বীরত্বগাথা পৌঁছাচ্ছে না বললেই চলে। প্রতি বছর তার মৃত্যুবার্ষিকী আসে এবং নীরবে চলে যায়, অথচ ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি রক্ষা করা বর্তমান প্রজন্মের দায়িত্ব। তার নামে একটি সড়ক কিংবা উল্লেখযোগ্য কোনো স্থাপনার নামকরণ করা এখন সময়ের দাবি। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে চান্দিনার এই তেজস্বী সূর্যসন্তানের নাম আগামী দিনের ইতিহাস থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

আরও পড়ুন